পল্লী সমাজ – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

১৪

বর্ষা শেষ হইয়া আগামী পূজার আনন্দ এবং ম্যালেরিয়াভীতি বাঙ্‌লার পল্লী-জননীর আকাশে, বাতাসে এবং আলোকে উঁকি-ঝুঁকি মারিতে লাগিল। রমেশও জ্বরে পড়িল। গত বৎসর এই রাক্ষসীর আক্রমণকে সে উপেক্ষা করিয়াছিল; কিন্তু, এ বৎসর আর পারিল না। তিন দিন জ্বরভোগের পর আজ সকালে উঠিয়া, খুব খানিকটা কুইনিন্‌ গিলিয়া লইয়া জানালার বাহিরে পীতাভ-রৌদ্রের পানে চাহিয়া ভাবিতেছিল, গ্রামের এই সমস্ত অনাবশ্যক ডোবা ও জঙ্গলের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীকে সচেতন করা সম্ভব কি না। এই তিনদিন মাত্র জ্বরভোগ করিয়াই সে স্পষ্ট বুঝিয়াছিল, যা হৌক, কিছু একটা করিতেই হইবে। মানুষ হইয়া সে যদি নিশ্চেষ্টভাবে থাকিয়া প্রতি বৎসর, মাসের পর মাস, মানুষকে এই রোগভোগ করিতে দেয়, ভগবান্‌ তাহাকে ক্ষমা করিবেন না। কয়েকদিন পূর্ব্বে এই প্রসঙ্গ আলোচনা করিয়া সে এইটুকু বুঝিয়াছিল, ইহার ভীষণ অপকারিতা সম্বন্ধে গ্রামের লোকেরা যে একেবারেই অজ্ঞ, তাহা নহে; কিন্তু, পরের ডোবা বুজাইয়া এবং পরের জমির জঙ্গল কাটিয়া, কেহই ঘরের খাইয়া বনের মহিষ তাড়াইয়া বেড়াইতে রাজী নহে। যাহার নিজের ডোবা ও জঙ্গল আছে, সে এই বলিয়া তর্ক করে যে, এ সকল তাহার নিজের কৃত নহে—বাপ পিতামহের দিন হইতেই আছে। সুতরাং যাহাদের গরজ, তাহারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়া লইতে পারে, তাহাতে আপত্তি নাই; কিন্তু, নিজে সে এজন্য পয়সা এবং উদ্যম ব্যয় করিতে অপারগ। রমেশ সন্ধান লইয়া জানিয়াছিল, এমন অনেক গ্রাম পাশাপাশি আছে, যেখানে একটা গ্রাম ম্যালেরিয়ায় উজাড় হইতেছে, অথচ, আর একটায় ইহার প্রকোপ নাই বলিলেই হয়। ভাবিতেছিল, একটুকু সুস্থ হইলেই, এইরূপ একটা গ্রাম সে নিজের চোখে গিয়া পরীক্ষা করিয়া আসিবে এবং তাহার পরে নিজের কর্ত্তব্য স্থির করিবে। কারণ, তাহার নিশ্চিত ধারণা জন্মিয়াছিল, এই ম্যালেরিয়াহীন গ্রামগুলির জল-নিকাশের স্বাভাবিক সুবিধা কিছু আছেই যাহা এম্‌নি কাহারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করিলেও, চেষ্টা করিয়া, চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিলে, লোক দেখিতে পাইবে। অন্ততঃ, তাহার নিতান্ত অনুরক্ত পীরগ্রামের মুসলমান প্রজারা চক্ষু মেলিবেই। তাহার ইন্‌জিনিয়ারিং শিক্ষা এতদিন পরে এমন একটা মহৎ কাজে লাগাইবার সুযোগ উপস্থিত হইয়াছে মনে করিয়া সে মনে মনে প্রফুল্ল হইয়া উঠিল।

“ছোটবাবু?” অকস্মাৎ কান্নার সুরে আহ্বান শুনিয়া রমেশ মহাবিস্ময়ে মুখ ফিরাইয়া দেখিল, ভৈরব আচার্য্য ঘরের মেঝের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া স্ত্রীলোকের ন্যায় ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে। তাহার ৭।৮ বৎসরের একটি কন্যা সঙ্গে আসিয়াছিল; বাপের সঙ্গে যোগ দিয়া তাহার চীৎকারে ঘর ভরিয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে বাড়ীর লোক, যে যেখানে ছিল, দোর-গোড়ায় আসিয়া ভিড় করিয়া দাঁড়াইল। রমেশ কেমন যেন একরকম হতবুদ্ধি হইয়া গেল। এই লোকটার কে মরিল, কি সর্ব্বনাশ হইল, কাহাকে জিজ্ঞাসা করিবে, কেমন করিয়া কান্না থামাইবে, কিছু যেন ঠাহর পাইল না। গোপাল সরকার কাজ ফেলিয়া ছুটিয়া আসিয়াছিল। সে কাছে আসিয়া ভৈরবের একটা হাত ধরিয়া টানিতেই ভৈরব উঠিয়া বসিয়া দুই বাহু দিয়া গোপালের গলা জড়াইয়া ধরিয়া, ভয়ানক আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল। এই লোকটা অতি-অল্পতেই মেয়েদের মত কাঁদিয়া ফেলে, স্মরণ করিয়া রমেশ ক্রমশঃ যখন অধীর হইয়া উঠিতেছিল, এমন সময় গোপালের বহুবিধ সান্ত্বনা-বাক্যে ভৈরব অবশেষে চোখ মুছিয়া, কতকটা প্রকৃতিস্থ হইয়া বসিল এবং এই মহাশোকের হেতু বিবৃত করিতে প্রস্তুত হইল। বিবরণ শুনিয়া, রমেশ স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। এত বড় অত্যাচার কোথাও কোনকালে সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া সে কল্পনা করিতেও পারিল না। ব্যাপারটা এই। ভৈরবের সাক্ষ্যে ভজুয়া নিষ্কৃতি পাইলে তাহাকে পুলিশের সন্দেহ-দৃষ্টির বহির্ভূত করিতে রমেশ তাহাকে তাহার দেশে পাঠাইয়া দিয়াছিল। আসামী পরিত্রাণ পাইল বটে, কিন্তু সাক্ষী ফাঁদে পড়িল। কেমন করিয়া যেন বাতাসে নিজের বিপদের বার্ত্তা পাইয়া ভৈরব কা’ল সদরে গিয়া সন্ধান লইয়া অবগত হইয়াছে যে, দিন পাঁচ-ছয় পূর্ব্বে বেণীর খুড়শ্বশুর রাধানগরের সনাৎ মুখুয্যে ভৈরবের নামে সুদে-আসলে এগারশ’ ছাব্বিশ টাকা সাত আনার ডিক্রি করিয়াছে এবং দুই একদিনের মধ্যেই তাহার বাস্তুভিটা ক্রোক করিয়া নিলাম ডাকিয়া লইবে। ইহা একতরফা ডিক্রি নহে। যথারীতি শমন বাহির হইয়াছে; কে তাহা ভৈরবের নাম দস্তখত করিয়া গ্রহণ করিয়াছে এবং ধার্য্যদিনে আদালতে হাজির হইয়া নিজেকে ভৈরব বলিয়া স্বীকার করিয়া, কবুলজবাব দিয়া আসিয়াছে। ইহার ঋণ মিথ্যা, আসামী মিথ্যা, ফরিয়াদী মিথ্যা। এই সর্ব্বব্যাপী মিথ্যার আশ্রয়ে সবল দুর্ব্বলের যথাসর্ব্বস্ব আত্মসাৎ করিয়া, তাহাকে পথের ভিখারী করিয়া, বাহির করিয়া দিবার উদ্যোগ করিয়াছে; অথচ, সরকারের আদালতে এই অত্যাচারের প্রতিকারের উপায় সহজ নহে। আইনমত সমস্ত মিথ্যাঋণ বিচারালয়ে গচ্ছিত না করিয়া কথাটি কহিবার জো নাই। মাথা খুঁড়িয়া মরিলেও কেহ তাহাতে কর্ণপাত করিবে না। কিন্তু এত টাকা দরিদ্র ভৈরব কোথায় পাইবে যে, তাহা জমা দিয়া, এই মহা-অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করিয়া আত্মরক্ষা করিবে। সুতরাং রাজার আইন, আদালত, জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট্‌ সমস্ত মাথার উপর থাকিতেও দরিদ্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিঃশব্দে মরিতে হইবে। অথচ, সমস্তই যে বেণী ও গোবিন্দ গাঙুলীর কাজ, তাহাতে কাহারও সন্দেহমাত্র নাই; এবং এই অত্যাচারের যত বড় দুর্গতিই ভৈরবের অদৃষ্টে ঘটুক, গ্রামের সকলেই চুপি চুপি জল্পনা করিয়া ফিরিবে, কিন্তু, একটি লোকও মাথা উঁচু করিয়া প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করিবে না, কারণ তাহারা কাহারো সাতেও থাকে না, পাঁচেও থাকে না; এবং পরের কথায় কথা কহা তাহারা ভালই বাসে না। সে যাই হউক, রমেশ কিন্তু আজ নিঃসংশয়ে বুঝিল, পল্লীবাসী দরিদ্র প্রজার উপর অসঙ্কোচে অত্যাচার করিবার সাহস ইহারা কোথায় পায়। এবং কেমন করিয়া দেশের আইনকেই ইহারা কসাইয়ের ছুরির মত ব্যবহার করিতে পারে। সুতরাং অর্থবল এবং কূটবুদ্ধি একদিকে যেমন তাহাদিগকে রাজার শাসন হইতে অব্যাহতি দেয়, মৃতসমাজও তেম্‌নি অন্যদিকে তাহাদের দুষ্কৃতির কোন দণ্ডবিধান করে না। তাই, ইহারা সহস্র অন্যায় করিয়াও, সত্যধর্ম্মবিহীন মৃত পল্লী-সমাজের মাথায় পা দিয়া এমন নিরুপদ্রবে এবং যথেচ্ছাচারে বাস করে। আজ, তাহার জ্যাঠাইমার কথাগুলো বারংবার মনে পড়িতে লাগিল। সে দিন সেই যে তিনি মর্ম্মান্তিক হাসি হাসিয়া বলিয়াছিলেন, “রমেশ, চুলোয় যাক্‌ গে তোদের জাত-বিচারের, ভাল-মন্দর ঝগড়াঝাঁটি; বাবা, শুধু আলো জ্বেলে দে রে, শুধু আলো জ্বেলে দে। গ্রামে গ্রামে লোক অন্ধকারে কাণা হয়ে গেল; একবার কেবল তাদের চোখ মেলে দেখ্‌বার উপায়টা ক’রে দে, বাবা! তখন আপনি দেখ্‌তে পাবে তারা, কোন্‌টা কালো, কোন্‌টা ধলো।” তিনি আরও বলিয়াছিলেন,—“যদি ফিরেই এসেছিস্‌ বাবা, তবে চ’লে আর যাসনে। তোরা মুখ ফিরিয়ে থাকিস্‌ বলেই তোদের পল্লী-জননীর এই দুর্দ্দশা!” সত্যই ত! সে চলিয়া গেলে ত ইহার প্রতিকারের লেশমাত্র উপায় থাকিত না!

রমেশ নিশ্বাস ফেলিয়া মনে মনে কহিল,—“হায় রে! এই আমাদের গর্ব্বের ধন—বাঙালার শুদ্ধ, শান্ত, ন্যায়নিষ্ঠ পল্লী-সমাজ!” একদিন হয় ত, যখন ইহার প্রাণ ছিল, তখন দুষ্টের শাসন করিয়া, আশ্রিত নর-নারীকে সংসারযাত্রার পথে নির্ব্বিঘ্নে বহন করিয়া লইয়া যাইবারও ইহার শক্তি ছিল। কিন্তু আজ ইহা মৃত; তথাপি অন্ধ পল্লীবাসীরা এই গুরুভার বিকৃত শবদেহটাকে পরিত্যাগ না করিয়া, মিথ্যা-মমতায় রাত্রি-দিন মাথায় বহিয়া বহিয়া, এমন দিনের-পর-দিন ক্লান্ত, অবসন্ন ও নির্জ্জীব হইয়া উঠিতেছে,—কিছুতেই চক্ষু চাহিয়া দেখিতেছে না। যে বস্তু আর্ত্তকে রক্ষা করে না, শুধু বিপন্ন করে, তাহাকেই সমাজ বলিয়া কল্পনা করার মহাপাপ তাহাদিগকে নিয়ত রসাতলের পানেই টানিয়া নামাইতেছে। রমেশ আরও কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসিয়া থাকিয়া, সহসা যেন ধাক্কা-খাইয়া উঠিয়া পড়িল, এবং তৎক্ষণাৎ সমস্ত টাকাটার একখানা চেক লিখিয়া, গোপাল সরকারের হাতে দিয়া কহিল,—“আপনি সমস্ত বিষয় নিজে ভাল ক’রে জেনে, টাকাটা জমা দিয়ে দেবেন, এবং যেমন ক’রে হোক, পুনর্বিচারের সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক ক’রে আস্‌বেন। এমন ভয়ঙ্কর অত্যাচার কর্‌বার সাহস তাদের আর যেন কোন দিন না হয়।” চেক হাতে করিয়া গোপাল সরকার ও ভৈরব উভয়ে কিছুক্ষণ যেন বিহ্বলের মত চাহিয়া রহিল। রমেশ পুনর্ব্বার যখন নিজের বক্তব্য ভাল করিয়া বুঝাইয়া কহিল এবং সে যে তামাসা করিতেছে না, তা নিঃসন্দেহে যখন বুঝা গেল, তখন অকস্মাৎ ভৈরব ছুটিয়া আসিয়া পাগলের ন্যায় রমেশের দুই পা চাপিয়া ধরিয়া কাঁদিয়া, চেঁচাইয়া, আশীর্ব্বাদ করিয়া, এমন কাণ্ড করিয়া তুলিল যে, রমেশের অপেক্ষা অল্পবলশালী লোকের পক্ষে নিজেকে মুক্ত করিয়া লওয়া সেদিন একটা কঠিন কাজ হইত। কথাটা গ্রামময় প্রচারিত হইতে বিলম্ব ঘটিল না। সকলেই বুঝিল, বেণী এবং গোবিন্দ এবার সহজে নিষ্কৃতি পাইবে না। ছোটবাবু যে তাঁহার চির-শত্রুকে হাতে পাইবার জন্যই এত টাকা হাতছাড়া করিয়াছে, তাহা সকলেই বলাবলি করিতে লাগিল। কিন্তু, এ কথা কাহারও কল্পনা করাও সম্ভবপর ছিল না যে, দুর্ব্বল ভৈরবের পরিবর্ত্তে ভগবান্‌ তাহারই মাথার উপর এই গভীর দুষ্কৃতির গুরুভার তুলিয়া দিলেন, যে তাহা স্বচ্ছন্দে বহিতে পারিবে।

তারপর মাসখানেক গত হইয়াছে। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে মনে মনে যুদ্ধঘোষণা করিয়া রমেশ এই একটা মাস তাহার যন্ত্রতন্ত্র লইয়া এম্‌নি উৎসাহের সহিত নানাস্থানে মাপ-জোপ করিয়া ফিরিতেছিল যে, আগামী কালই যে ভৈরবের মকর্দ্দমা, তাহা প্রায় ভুলিয়াই গিয়াছিল। আজ সন্ধ্যার প্রাক্কালে অকস্মাৎ সে কথা মনে পড়িয়া গেল, রসুনচৌকির সানাইয়ের সুরে। চাকরের কাছে সংবাদ পাইয়া রমেশ আশ্চর্য্য হইয়া গেল যে, আজ ভৈরব আচার্য্যের দৌহিত্রের অন্নপ্রাশন। অথচ সে ত কিছুই জানে না। শুনিতে পাইল, ভৈরব আয়োজন মন্দ করে নাই। গ্রামশুদ্ধ সমস্ত লোককেই নিমন্ত্রণ করিয়াছে; কিন্তু, রমেশকে কেহ নিমন্ত্রণ করিতে আসিয়াছিল কি না সে খবর বাড়ীর কেহই দিতে পারিল না। শুধু তাই নয়। তাহার স্মরণ হইল, এত বড় একটা মামলা ভৈরবের মাথার উপর আসন্ন হইয়া থাকা সত্ত্বেও সে প্রায় কুড়িপঁচিশ দিনের মধ্যে একবার সাক্ষাৎ পর্য্যন্ত করিতে আসে নাই! ব্যাপার কি! কিন্তু, এমন কথা তাহার মনে উদয় হইয়াও হইল না যে, সংসারের সমস্ত লোকের মধ্যে ভৈরব তাহাকেই বাদ দিতে পারে। তাই নিজের এই অদ্ভুত আশঙ্কায় নিজেই লজ্জিত হইয়া, রমেশ তখনই একটা চাদর কাঁধে ফেলিয়া একেবারে সোজা আচার্য্য-বাড়ীর উদ্দেশে বাহির হইয়া পড়িল। বাহির হইতেই দেখিতে পাইল, বেড়ার ধারে দুই-তিনটা গ্রামের কুকুর জড় হইয়া, এঁটো কলাপাত লইয়া বিবাদ করিতেছে এবং অনতিদূরে রসুনচৌকি-ওয়ালারা আগুন জ্বালাইয়া তামাক খাইতেছে এবং বাদ্যভাণ্ড উত্তপ্ত করিতেছে। ভিতরে প্রবেশ করিয়া দেখিল, উঠানে শতছিদ্রযুক্ত সামিয়ানা খাটানো এবং সমস্ত গ্রামের সম্বল পাঁচছয়টা কেরোসিনের বহু পুরাতন বাতি মুখুয্যে ও ঘোষালবাটী হইতে চাহিয়া আনিয়া জ্বালা হইয়াছে। তাহারা স্বপ্ন-আলোক এবং অপর্য্যাপ্ত ধূম উদ্গিরণ করিয়া সমস্ত স্থানটাকে দুর্গন্ধে পরিপূর্ণ করিয়া দিয়াছে। খাওয়ানো সমাধা হইয়া গিয়াছিল—বেশী লোক আর ছিল না। পাড়ার মুরুব্বিরা তখন যাই-যাই করিতেছিলেন; এবং ধর্ম্মদাস হরিহর রায়কে আরও একটুখানি বসিতে পীড়াপীড়ি করিতেছিলেন। গোবিন্দ গাঙুলি একটুখানি সরিয়া বসিয়া, কে একজন চাষার ছেলের সহিত নিরিবিলি আলাপে রত ছিলেন। এম্‌নি সময়ে রমেশ দুঃস্বপ্নের মত একেবারে প্রাঙ্গণের বুকের মাঝ্‌খানে আসিয়া দাঁড়াইল। তাহাকে দেখিবামাত্র ইহাদের মুখও যেমন এক মুহূর্ত্তে মসীবর্ণ হইয়া গেল, শত্রুপক্ষীয় এই দুইটা লোককে এই বাটীতেই এমনভাবে যোগ দিতে দেখিয়া রমেশের মুখও উজ্জ্বল হইয়া উঠিল না। কেহই তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া বসাইতে অগ্রসর হইল না—এমন কি, একটা কথা পর্য্যন্তও কেহ কহিল না। ভৈরব নিজে সেখানে ছিল না। খানিক পরে সে বাটীর ভিতর হইতে কি একটা কাজে—‘বলি গোবিন্দ দা’—বলিয়া বাহির হইয়াই উঠানের মাঝ্‌খানে যেন ভূত দেখিতে পাইল, এবং পরক্ষণেই ছুটিয়া বাটীর ভিতরে ঢুকিয়া পড়িল। রমেশ শুষ্কমুখে একাকী যখন বাহির হইয়া আসিল, তখন প্রচণ্ড বিস্ময়ে তাহার মন অসাড় হইয়াছিল। পিছনে ডাক শুনিল,—“বাবা, রমেশ!” ফিরিয়া দেখিল, দীনু হন্‌হন্‌ করিয়া আসিতেছে। কাছে আসিয়া কহিল,—“চল বাবা, বাড়ী চল।” রমেশ একটুখানি হাসিবার চেষ্টা করিল মাত্র। চলিতে চলিতে দীনু বলিতে লাগিল,—“তুমি ওর যে উপকার করেচ বাবা, সে ওর বাপ-মা কর্‌ত না। এ কথা সবাই জানে, কিন্তু উপায় ত নেই। কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে আমাদের সকলকেরই ঘর কর্‌তে হয়; তাই তোমাকে নেমন্তন্ন কর্‌তে গেলে—বুঝ্‌লে না বাবা—ভৈরবকেও নেহাৎ দোষ দেওয়া যায় না—তোমরা সব আজকালকার সহরের ছেলে—জাতটাত তেমন ত কিছু মান্‌তে চাও না—তাইতেই—বুঝ্‌লে না, বাবা,—দু’দিন পরে ওর ছোট মেয়েটিও প্রায় বারোবছরের হ’ল ত—পার কর্‌তে হবে ত বাবা? আমাদের সমাজের কথা সবই জান বাবা—বুঝ্‌লে না বাবা—” রমেশ অধীরভাবে কহিল,—“আজ্ঞে হাঁ, বুঝেচি।” রমেশের বাড়ীর সদরদরজার কাছে দাঁড়াইয়া দীনু খুসি হইয়া কহিল,—“বুঝ্‌বে বৈ কি বাবা, তোমরা ত আর অবুঝ নও। ও ব্রাহ্মণকেই বা দোষ দিই কি ক’রে—আমাদের বুড়োমানুষের পরকালের চিন্তাটা—”

“আজ্ঞে হাঁ, সে ত ঠিক কথা-” বলিয়া রমেশ তাড়াতাড়ি ভিতরে প্রবেশ করিল। গ্রামের লোকে তাহাকে ‘একঘরে’ করিয়াছে, তাহা বুঝিতে তাহার আর বাকী রহিল না। নিজের ঘরের মধ্যে আসিয়া, ক্ষোভে, অভিমানে তাহার দুই চক্ষু জ্বালা করিয়া উঠিল। আজ এইটা তাহার সবচেয়ে বেশি বাজিল যে, বেণী ও গোবিন্দকেই ভৈরব আজ সাদরে ডাকিয়া আনিয়াছে; এবং গ্রামের লোক সমস্ত জানিয়া-শুনিয়াও ভৈরবের এই ব্যবহারটা শুধু মাপ করে নাই, সমাজের খাতিরে রমেশকে সে যে আহ্বান পর্য্যন্ত করে নাই, তাহার এই কাজটাকেই প্রশংসার চক্ষে দেখিতেছে।

“হা, ভগবান!” সে একটা চৌকির উপর বসিয়া পড়িয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল,—“এ কৃতঘ্ন জাতের, এ মহাপাতকের প্রায়শ্চিত্ত হবে কিসে! এত বড় নিষ্ঠুর অপমান কি ভগবান্‌ তুমিই ক্ষমা করতে পার্‌বে?”

পোস্টটি শেয়ার করুন