ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী – শওকত ওসমান

মামাও সেদিন সহজে ভাগ্নের নিকট হার মানতে রাজি ছিলেন না।

মুরারি। চেষ্টা করলে হবে।

বিজয়। চেষ্টা—?

মুরারি। হ্যাঁ। কেউ কখনো তা করেনি। আমি বলছি, আমি চেষ্টা করব। সফল হব না কেন। একবার ফেল করলে আবার তেড়ে ধরব। এইভাবে সফল না হলে বুঝব অসম্ভব।

বিজয়। খোকা, তোর মাথায় এই খেয়াল কেন চেপে বসল?

কোনো জবাব দিল না মুরারি। মামা নিজের মনে বলে উঠলেন, ‘সব জায়গায় যেতে টিকিট লাগে, তা বুঝি তোর হিসেবে নেই?’

ভাগ্নে তারও কোনো উত্তর দিল না। বরং সেই মুহূর্তে মেস থেকে বেরিয়ে পড়ল সর্বত্র বিরাজমানতার সাধনায়।

মুরারি রিপোর্ট দিল ওই দিন রাত্রি এগারোটার সময় বাসায় ফিরে। তার প্রথম পরিকল্পনা : সে শহরের এক ইঞ্চি জায়গা বাদ দিবে না যেখানে তার পা বা হাত পড়বে না। বিকেলে বেরিয়ে সে প্রচুর হেঁটেছে। প্রত্যেক জায়গায় তার উপস্থিতি সে এইভাবে জানান দেবে।

মামা বাধা দিলেন না বা কোনো তর্কে গেলেন না। তিনি ভাবলেন : পুরাতন ব্যাধি, বোধ হয়, আবার নতুন আকারে দেখা দিয়েছে।

মুরারির বাড়িতে এসব খবর পৌঁছাল না।

মামার জিদেই সে শহরে পড়াশোনা শুরু করে। এখন সব অপরাধের বোঝা তার মাথার ওপর পড়বে। তাই তিনি স্থির করলেন, কী ঘটে দেখা যাক আরো কিছুদিন। নেহাত বেগতিক কিছু হলে ওকে আবার গাঁয়ে ফিরিয়ে নেয়া যাবে।

তেমন কোনো গোলমাল বাধায় না মুরারি। খেয়ালমতো সে বেরিয়ে যায় আবার আস্তানায় ফিরে আসে। মেসে বিজয়বাবুকে সকলে শ্রদ্ধা করে। তিনি তাদের পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কোনো ভায়োলেন্ট, উগ্র পাগল নয়। মাথায় কিছু ছিট আছে। তাই আচরণ অস্বাভাবিক। নচেৎ মেসে কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা নেই তার।

মুরারির লেখাপড়া শিকেয় উঠেছে, তা বলা চলে না। মাঝে মাঝে সে কলেজে যায়, ক্লাস করে। তখন তার মধ্যে পাগলামির সামান্য রেশ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। বিজয়বাবু তাই ভাগ্নে সম্বন্ধে আশান্বিত। এসব একদিন কেটে যাবে।

কিন্তু তেমন কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।

মেসে খবরের কাগজ নেওয়া হয়—একখানা ইংরেজি ও একখানা বাংলা দৈনিক। মুরারি প্রথমে সভাসমিতির কলামে নজর রাখে। বড় বড় মিটিং হলে তো আর কথা নেই। সে ঠিক সময়মতো পৌঁছে যাবে। কিন্তু সভায় কিছু শোনার প্রয়োজন নেই তার। সে এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকবে! রামঃ, রামঃ! তেমন বান্দা নয় মুরারি। সে সভায় এক প্রান্ত থেকে উজিয়ে আরেক প্রান্তে গিয়ে ঠেকবে। ভিড় থাকলে তা ঠেলে ঠেলেই এগোবে। সভা শেষে মেসে ফিরে সে মামাকে দেবে রিপোর্ট। মিটিংয়ের নয়, তার নিজের। ‘যদ্দূর পারা যায় আমি নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছি। ঈশ্বরের সঙ্গে আমার প্রতিযোগিতা।’ এমনধারা মন্তব্য করত মুরারি মামার কাছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাঁ-হুঁ করে তিনি সেরে দিতেন। আবার মাঝে মাঝে সতর্কবাণী শোনাতেন।

—শোনো বাপু, ঈশ্বরের সঙ্গে খামকা লড়তে চাও কেন?

—কেউ লড়ে না, আমি লড়ে দেখতে চাই!

—অসম প্রতিযোগিতা। কোথায় দুনিয়ার স্রষ্টা আর কোথায় তুমি! কোথায় রাজাভোজ আর…। বাক্য অসমাপ্ত থাকে।

—তবু চেষ্টা ভালো।

—অসম প্রতিযোগিতা আখেরে সব্বনাশ টেনে আনে।

—মামা, ওসব বস্তাপচা বুলি রেখে দিন।

এমন অবজ্ঞার সুরে মুরারি কোনোদিন গুরুজনের সঙ্গে কোনো কথা উচ্চারণ করেনি।

মামা তো ভাগ্নের সব খবর রাখতেন না। তিনি ছাপোষা কেরানি মানুষ। নিজের চাকরি এবং ঝামেলা নিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত। কাজেই মুরারির সব হালচালের খবর রাখা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

একদিন মুরারি শহরের জলের ট্যাংকের ছাদের কাছাকাছি পৌঁছে বক্তৃতা জুড়ে দিয়েছিল। পথচারীরা বিস্মিত, যেকোনো মুহূর্তে একটা দুর্ঘটনার আশঙ্কা তারা করছিল। লোক জমে গেল তামাশা দেখতে। শেষে ফায়ার ব্রিগেডে খবর দেওয়া হলো। তারা সে সিঁড়ি বেয়ে মুরারির কাছাকাছি পৌঁছে নানা আর্জি-মিনতি করে। পরে সুবোধ বালকের মতো মুরারি নেমে আসে। নামাও তো কম বিপজ্জনক নয়। খুব গালাগাল খেয়েছিল সেদিন মুরারি পুলিশের কাছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন