ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী – শওকত ওসমান

ঠিক এই সময়ে উপেনবাবু বলে ফেললেন, ‘বেশ। তারপর?’

‘তারপর?’ পাল্টা মুরারির প্রশ্ন।

‘হ্যাঁ, তারপর।’ শিক্ষকের সায়।

‘এখানে একটা কিন্তু আছে।’

‘বলে ফেলো।’ শিক্ষকের তাগিদ।

‘স্যার, আমি সন্ন্যাসী হয়ে গেছি। তা নির্ঘাত অতীব সত্য। কিন্তু, স্যার আমার এখনও ‘নাইট-পলিশান’ হয়ে যায়।’

সেদিন উপেনবাবুর মতো রাশভারী শিক্ষক ক্লাসে না থাকলে আমরা যে কী নাদে চিৎকারে-হল্লায় হেসে উঠতাম, তা ঈশ্বর জানেন। আমাদের মুখ চাপা হাতের তালুর ভেতর। উপেনবাবু গম্ভীর গলায় ছড়ি নাচিয়ে (তা ছাড়া তিনি ক্লাসে আসতেন না) প্রায় যুগপৎ ধমক ও চিৎকারের সংযোগ ঘটালেন। আমাদের কানে শুধু বাড়ি পড়তে থাকে, ‘বেরো শুয়ার, বেরো।’

নিমেষে মুরারি হাওয়া।

ক্লাস শেষ হতে তখনো পাঁচ মিনিট বাকি।

উপেনবাবুর মতো নীতিপরায়ণ মানুষ, যিনি পুরো সময় ক্লাসে থাকেন, সেদিন আদেশের সুরেই বললেন, ‘ক্লাস শেষ। চুপচাপ বসে থাকো, অন্য টিচার না আসা পর্যন্ত। গোলমাল কোরো না।’

বলা বাহুল্য, তিনি চোখের আড়াল হওয়া মাত্র আমরা কিছু অকালপক্ব বালক (সংখ্যা শতকরা আশি) সশব্দে হো হো করে হেসে উঠলাম। কয়েকজন নিরীহ কিশোর মুরারির উচ্চারিত ইংরেজি শব্দের মানে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল আশপাশের সহপাঠীদের কাছ থেকে। ফলে হাসির হররা আর সহজে থামতে চায় না, তাদের বিলম্বে যোগদান-হেতু।

এহেন মুরারি কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিল। দু-তিন বছর নষ্ট হলো তার। কিন্তু সে ম্যাট্রিক পাস করে ফেলল এবং প্রথম বিভাগে। বাপ-মা তো তার ভবিষ্যতের আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তবু নসিব ফেরে। পাতা-চাপা আর পাথর-চাপা কপালে তফাত আছে।

এখানে দেখা গেল, কপাল প্রথম পর্যায়ে পড়ে। খুব ভালো রেজাল্ট, মুরারি আই-এ পাস করে ফেলল। বাপ-মা খাতিরজমা। দু-তিন বছর উপর্যুপরি কেটে গেছে। আর বোধ হয় মাথার গেরো নেই।

তা ছাড়া ম্যাট্রিক পাসের পর যখন মুরারির মামা বিজয়বাবু ওকে শহরে কলেজে ভর্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, মুরারির মা বেঁকে বসেছিলেন, “দাদা, চাষিবাসির ছেলে অত ‘নেকাপড়ায়’ কাজ নেই। মুরারি আমার কাছে থাকবে। স্বাভাবিক হলে আলাদা কথা ছিল। ওকে শহরে পাঠাব না।”

বিজয়বাবু এই এলাকায় সকলের শ্রদ্ধাভাজন। কৃষক-পল্লী থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কেরানির চাকরি পেয়েছেন। তা কম গৌরবের কথা নয়। তাঁর কথার দাম আছে। বোন নিজের মতামত দিল। কিন্তু ভগ্নীপতির শ্যালকের মতে মত। শ্যালক বয়সে বড়। তদুপরি সরকারি চাকুরে। বোনের বায়না টিকল না। তা ছাড়া শহরে কলেজের পড়ার হাতছানি মুরারিকে বেশ উত্তেজিত রেখেছিল। মাকে সে নিজের রাস্তায় টেনে নিয়ে এলো সহজে।

দু’বছর পর বিজয়বাবুর মর্যাদা প্রায় দেবতার পর্যায়ে পৌঁছায় আর কী। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সব অক্ষরে অক্ষরে ফলতে শুরু করেছে। যাকে সবাই বাতিল করে দিয়েছিল, সে পরীক্ষায় অমন ফল দেখাবে, কেউ ভাবতে পারেনি।

মুরারি বি-এ ক্লাসে ভর্তি হলো। শহরের পথঘাট চেনা হয়ে গেছে। চালচলন রপ্ত হতে বেশি দেরি লাগেনি। ফিটফাট থাকে সে। মাথার চুল বেশ পরিপাটি করে রাখে। কিন্তু টেরি কাটে না। তার বাবা বলেন, অমন টেরিকাটা ছেলেরা নাকি গোল্লায় যায় আর ওরা দুশ্চরিত্র হয়। মামা বিজয়বাবুও সেই পন্থী। মুরারি তা মেনে নিয়েছিল।

এককথায়, শহুরে দু’বছর বসবাসের ফলে মুরারি আদব-কায়দায় পিছিয়ে পড়ে থাকেনি। ছুটিতে গাঁয়ে ফিরলে বাবা খুব আনন্দিত হতেন। মা তো ঠাকুরের সিন্নি মানত, পুত্রের কল্যাণ-প্রার্থনায়। এক নয়, কত ঠাকুরের, তা তাঁরই জানা। বিজয়বাবু প্রায়ই বলতেন, ‘তোমার এই ছেলে আখেরে কাজ দেবে।’ ভগ্নীপতি এমন কথার জবাব দিতেন বৈকি, ‘দাদা, আপনি ওকে আশীর্বাদ করুন, ও যেন সুস্থ থাকে। নইলে ওর কাছে থেকে আমি কিছু পিত্যেশ করি নে।’

সবই ঠিকঠিক চলছিল। মুরারির বি-এ ক্লাসে কয়েক মাস কেটে গেল। প্রথম প্রথম কলেজের ডিবেটিং, অন্যান্য অনুষ্ঠানে সে যোগ দিত না। ইদানীং শুধু যোগ না, সে রীতিমতো শরিক হতে লাগল। ছড়িয়ে পড়ল মুরারির খ্যাতি ভালো ডিবেটার হিসেবে। আকর্ষণ, মুখর চেহারা। তেমনই কণ্ঠ। পূর্বে স্কুলে আবৃত্তির সময় তো বোঝা যেত। এখন তর্কস্থলে আর একরকমের খোলতাই রূপ দেখা গেল। শিক্ষকরা খুব আশান্বিত। আন্তকলেজ তর্ক-প্রতিযোগিতায় তাঁরা মুরারিকে প্রতিনিধিরূপে পাঠাবেন। শুধু বাচনভঙ্গি নয়, মুরারির ধারালো যুক্তি সেই সঙ্গে ঝিলিক দিয়ে উঠত। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ। প্রতিপক্ষ ঘায়েল বা ধরাশায়ী।

এ হেন মুরারি।

কিন্তু ঠিক পাঁচ-ছ’মাস পরে তার মাথার ব্যাধি আবার দেখা দিল। তখন সে আর নিয়মিত ক্লাস করত না। কলেজে গেলে একদিকে চুপচাপ বসে থাকত। ব্যক্তিত্বে, গুণে মুগ্ধ অনেকে মুরারির বন্ধুত্বলোভী। তারা মুরারির ভেতরগোঁজা ভাব দেখে ভাবলে, ‘ব্যাটা ভালো ডিবেটার। সেই গুমরে আর কারো সঙ্গে মিশতে অনিচ্ছুক।’ অনেকে ওর পরিবর্তন দেখে ক্ষুব্ধ। ডিবেটিং ক্লাবেও সে আর রীতিমতো যায় না। যেদিন যায়, প্রতিপক্ষকে প্রায় মেরে বসার উপক্রম করে। তর্ক আর তার কাছে বাকযুদ্ধ নয়। সুযোগ পেলে সে অন্য দলের মাথা গুঁড়িয়ে দিয়ে তবে শান্ত হবে। একদিন তো হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। এক অধ্যাপক মাঝখানে পড়ে ব্যাপারটা আর এগোতে দিলেন না। কলেজের আবহাওয়া সামান্য তেতে রইল। কারণ, দলাদলি। মুরারির সমর্থক অবিশ্যি কম ছিল না। কিন্তু সে নিয়মিত কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিল। প্রথম দিকে তিন চার দিন বাদ যেত হ্নায়। পরে হ্নায় সাত দিন এবং তা আরো গড়িয়ে যেতে লাগল।

পোস্টটি শেয়ার করুন