এক কাল রাতের ছোবল – আবদুল্লাহ আল-মুতী

একে তো সাইক্লোনের কেন্দ্রে হাওয়ার নিম্নচাপের ফলে সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে। তার সাথে যোগ হয় একটানা বইতে থাকা হাওয়ার চাপ। কুলের দিকে—বিশেষ করে অগভীর পানিতে এভাবে কদিন ধরে ক্রমাগত হাওয়া বইতে থাকলে পানি ফুলে উঠতে পারে ২০ ফুট উঁচু হয়ে।

তার উপর যদি আবার যোগ হয় ভরাজোয়ার তাহলে পানি ফুলে উঠবে আরো বেশি। চাঁদের আর সূর্যের টানে সমুদ্রের পানি ফুলে উঠতেই জোয়ার আসে। পৃথিবী, চাঁদ আর সূর্য যদি পড়ে মোটামুটি এক সরলরেখায় তাহলে চাঁদ আর সূর্যের আকর্ষণের টান যোগ হয় এক সাথে। তখন জোয়ার আসে সবচেয়ে জোরালো হয়ে।

১৯৬০ সালের অক্টোবর মাসেও বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে এক বড় সাইক্লোন হয়েছিল। কিন্তু সেটা ছিল মন্দা জোয়ারের সময়। তাই সে সাইক্লোনে জলোচ্ছ্বাস তেমন উঁচু হয়ে ওঠেনি। সেবারে মানুষ মারা গিয়েছিল হাজার পনের। কিন্তু তার দশ বছর পরে ১৯৭০ এর সাইক্লোন—যখন হাওয়া বইল ঘণ্টায় প্রায় দেড়শো মাইল বেগে, আর তখন ঠিক ভরা জোয়ারের সময়। বিশাল উঁচু পানির তোড়ে ১৯৬০ সালের সাইক্লোনের তুলনায় মারা গেল প্রায় তিরিশ গুণ বেশি লোক।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বঙ্গোপসাগরের চারপাশে উপকূলের আকারও এমন যে, পদ্মা, মেঘনার মোহনার কাছে পটুয়াখালী নোয়াখালির দিকে যেন একটা ফানেলের সরু বোটার মত তৈরি হয়েছে। কাজেই হাওয়ার বেগে পানি এই সরু মুখের দিকে সহজেই ফেঁপে ফুলে ওঠে।

১৯৭০ সালের সাইক্লোনের উৎপত্তি নভেম্বরের শুরুতে। হয়তো কম্বোডিয়ার কাছাকাছি কিংবা আরো পূর্বে—প্রশান্ত মহাসাগরের কোথাও নভেম্বরের পাঁচ ছয় তারিখে এটা মালয় উপদ্বীপ পেরিয়ে পৌঁছায় ভারত মহাসাগরে। তারপর সপ্তাহখানেক ধরে এর ঘুরপাক খাওয়ার বেগ বাড়তে থাকে। আর এটা ক্রমে ক্রমে এগোতে থাকে বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকে।

নভেম্বরের ১১ তারিখে মার্কিন আবহাওয়া উপগ্রহ থেকে এই সাইক্লোনের যে ছবি পাওয়া গেল তার খবর পৌঁছল চট্টগ্রামের কাছে ঝড়ের পূর্বাভাস কেন্দ্রে। তখন সাইক্লোন বাংলাদেশের উপকূল থেকে শ’দুই মাইল দূরে। বেতারে ঘোষণা করা হল ঝড়ো আবহাওয়ার পূর্বাভাস। কিন্তু কেউ কখনো ভাবেনি সেই ঝড়ো আবহাওয়া আসবে এমন প্রলংকর রূপ নিয়ে। সত্যি সত্যি যখন ১২ তারিখ সন্ধ্যায় ঝড় প্রবল হয়ে উঠল তখনই কি করে যেন কক্সবাজার বেতার যন্ত্র আর চট্টগ্রামের মধ্যে তার যোগাযোগ হয়ে গেল বিকল। রাত সাড়ে এগারোটায় উপকূলের উপর সাইক্লোন হানল তার প্রচণ্ড ছোবল। চর মনপুরা, চর জব্বার, চর আবদুল্লাহ, রামগতি এমনি সব উপকূলের দ্বীপাঞ্চলের লোকদের কাছে মনে হল এই বুঝি সেই কেয়ামতের দিন।

শুধু যে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারা গেল তাই নয়—মারা গেল প্রায় পাঁচ লাখ গরু বাছুর, বানে ভেসে গেল প্রায় আড়াই লাখ ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত হল আরো প্রায় এক লাখ। কয়েকটি জেলার জমির ফসল প্রায় সব নষ্ট হয়ে গেল। লোনা পানিতে নষ্ট হল জমির উৎপাদন ক্ষমতা। পানিতে ডুবে গেল বা ধ্বংস হল হাজার দশেক জেলে নৌকা।

এমন সাইক্লোন কি আর আসবে? খুব সম্ভব আসবে। সাইক্লোনের হাত থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়ার কায়দা এখনো মানুষের জানা নেই। উপকূলে কিছু কিছু বাঁধ দেবার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তৈরি হয়েছে উঁচু আশ্রয়স্থল, পাকা বাড়ি। উন্নত হয়েছে পূর্বাভাসের ব্যবস্থা, বেতার যোগাযোগের ব্যবস্থা। পূর্বাভাস পেয়ে নিরাপদ আশ্রয় স্থান নেওয়াই এখন পর্যন্ত একমাত্র রক্ষাব্যবস্থা।

তবু নানা দেশে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালাচ্ছেন। কেমন করে জয় করা যায় মেঘের পঞ্জিকে হাওয়ার পঞ্জিকে। কোন কোন দেশে মেঘের উপর ভেসে করে রাসায়নিক গুঁড়ো ছিটিয়ে দিতে কাবু করা হয়েছে সাধারণ ঝড়কে। মেঘের পেটে রকেট ছুড়ে পাঠানো গিয়েছে শিলাবর্ষণ। নানা পরীক্ষা চলছে সাইক্লোন নিয়েও। হয়তো বিজ্ঞানীরা এটা একদিন সফল হবে। কাবু করা যাবে প্রচণ্ড সাইক্লোনকেও।


পোস্টটি শেয়ার করতে ক্লিক করুন
Scroll to Top