এক কাল রাতের ছোবল
– আবদুল্লাহ আল-মুতী
দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি কোথায়? সবচেয়ে লম্বা নদী কোনটি? ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক যুদ্ধ হয়েছিল কবে? সব চেয়ে বেশি লোক কোন দেশে?
জানি, তোমরা সবাই পারবে এসব প্রশ্নের জবাব দিতে। এমনি নানা বড় আর বেশির খবর লেখা থাকে স্কুলের বইতে— বাইরের অনেক বইতেও। সবচেয়ে বড় কিছু করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে কেউ দেয় অলিম্পিকে দৌড়, কেউ বা রাখে অতি লম্বা দাড়ি, কোন দেশের রকেট-যান পাড়ি দেয় গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে।
কিন্তু কোন রকম চেষ্টা-চরিত্র ছাড়াই আমাদের দেশ ইতিহাসে স্থান পেয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যে।
১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে অতর্কিতে হানা দেয় এই ভয়ঙ্কর সাইক্লোন। এক রাতে মারা পড়ে অন্তত পাঁচ লক্ষ মানুষ। ভাঙে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। পানিতে ভেসে যায় বহু লক্ষ গরু-বাছুর।
এই শতাব্দীতে পৃথিবীর কোথাও এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর হয়নি। মানুষের ইতিহাসেই এমন প্রলয়ংকর দুর্যোগ আর কখনও হয়েছে কিনা সন্দেহ।
ঝড় বাদলের দেশ বাংলাদেশ। কালবোশেখী ঝড় ওঠে প্রতি বছরই। গ্রীষ্মকালে সূর্যের খাড়া তাতে তেতে ওঠে মাটি, পানি, হাওয়া। সূর্যের তাত মানে হল সূর্যের তেজ। এই তেজ নিয়ে হাওয়ায় শুরু হয় দারুণ দাপাদাপি। তাই আমাদের দেশে সচরাচর বোশেখ-জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-মে) আর আশ্বিন-অগ্রহায়ণ (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) মাসের দিকেই বেশি দেখা দেয় সাইক্লোন।
পৃথিবীতে বিষুবরেখার কাছাকাছি এলাকায় সূর্যের তাপ বেশি পড়ে। তাই সচরাচর এসব এলাকাতেই সৃষ্টি হয় দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বড় ঝড়। বিষুবরেখার কাছাকাছি সমুদ্রের উপরকার উষ্ণ হাওয়ায় সাধারণত জন্ম নেয় প্রচণ্ড সাইক্লোন। আর দুনিয়ার প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষ মারা যায়, তার পাঁচ ভাগের চার ভাগই মারা যায় এই সব এলাকার সাইক্লোনে।
আমাদের দেশে এমনি সামুদ্রিক ঝড়কে বলা হয় সাইক্লোন। আবার মধ্য আমেরিকার কাছাকাছি আটলান্টিক মহাসাগরে যেসব ঝড় সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় হারিকেন। জাপানের কাছাকাছি উত্তর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড় জন্মালে তার নাম হয় টাইফুন। আদতে সাইক্লোন, হারিকেন আর টাইফুন একই জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন নাম।
তাহলে কি সে জিনিস? কেমন করে সৃষ্টি হয় সাইক্লোন আর কেনই বা বাংলাদেশে এমন ঘন ঘন ঘটছে এই সর্বনাশা ঝড়?
সাইক্লোন যেমন-তেমন ঝড় নয়। বিপুল হাওয়ার রাশি, যা একটা কেন্দ্রের চারপাশে চাকার মত ঘুরপাক খাচ্ছে। এই বিশাল চাকা চওড়ায় হতে পারে একশ থেকে চারশ মাইল। আর হাওয়ার রাশি ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে বিপুল বেগে ঘুরপাক খেতে খেতে ঢুকতে থাকে চাকার কেন্দ্রের দিকে। এমনি ঝড়কে সাইক্লোন বলা হয়, হাওয়ার বেগ অন্তত ঘণ্টায় ৪৫ মাইল হলে। তবে অনেক সাইক্লোনেই হাওয়ার বেগ একশ-সোয়া শ মাইল। কখনও তারও বেশি।
চাকার ঠিক মাঝখানে হাওয়ার বেগ সামান্য—ঘণ্টায় দশ পনের মাইল বা আরো কম। এমনি প্রায় শান্ত কেন্দ্রটি হতে পারে পাঁচ থেকে ত্রিশ মাইল চওড়া।
গ্রীষ্মকালে সাগরের চেয়ে ডাঙ্গা বেশি গরম। বেশি হালকা সেখানকার হাওয়া। তাই সাইক্লোনের এই ঘূর্ণিবায়ুর চাকাটা ক্রমে ক্রমে সমুদ্র থেকে এগিয়ে চলে ডাঙ্গার দিকে। চাকার কেন্দ্রে হাওয়ার চাপ হয় খুব কম। তার ফলে প্রচণ্ড হাওয়ার সাথে সাথে সমুদ্র থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প বয়ে নিয়ে আসে প্রবল বৃষ্টি বাদল। হাওয়ার প্রচণ্ড তোড়ে উড়ে যায় ঘরবাড়ি চাল, ভেঙে পড়ে গাছপালা। বৃষ্টিতে বন্যায় সয়লাব হয়ে যায় চারদিক।
হাওয়ার সাথে সাথে সাগর থেকে ছুটে আসে বিপুল জলোচ্ছ্বাস। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকর সাইক্লোনে জলোচ্ছ্বাস উঠেছিল দশ ফুট থেকে ত্রিশ ফুট উঁচু হয়ে। এমন বিশাল উঁচু পানির তোড়ে ঘরবাড়ি, মানুষ, গরু ছাগল কোন কিছুরই টিকে থাকার কথা নয়। নানা কারণে সৃষ্টি হয় এমনি প্রচণ্ড পানির উচ্ছ্বাস।




