বাঘের সাজা
রাজার মস্ত বড় বাগানবাড়ি। সে বাড়ির সিংহ-দরজার পাশে একটি লোহার খাঁচা। সেই খাঁচায় বন্দী ছিল একটা বাঘ। বাড়ির সামনে দিয়ে কত লোক যাওয়া-আসা করে! বাঘ হাতজোড় করে সকলকেই বলে, একটি বার খাঁচার দরজাটা খুলে দাও না ভাই। বাঘের কথা শুনে সকলেই বলে, ওরে আমার চালাক বাঘ রে। তোমার খাঁচার দরজা খুলে দিই আর তুমি ছাড়া পেয়ে আমার ঘাড় মটকাও।
একদিন রাজার মেয়ের বিয়ে। মহা ধুমধাম! অনেক লোক বিয়ে খেতে এসেছে। খেয়েদেয়ে সবাই খুশি মনে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এদের মধ্যে ছিল এক জন সহজ সরল ভাল মানুষ। তাকে দেখে বাঘ হাতজোড় করে বলল, লক্ষ্মী ভাই, তোমাকে হাজার সালাম। বাঘের কথা শুনে লোকটির মন গলে গেল। সে মনে মনে ভাবল, আহা রে, বাঘটা তো ভারি ভাল। এমন বাঘকে কিনা রাজা বন্দী করে রেখেছে। সে বাঘকে বলল, ও বাঘ, তুমি কি চাও? বাঘ বলল, তুমি বড় দয়ালু। দয়া করে এই খাঁচার দরজাটা খুলে দাও না। আমি বনের বাঘ বনে চলে যাই।
বাঘের কাকুতি-মিনতি শুনে লোকটা খাঁচার দরজা খুলে দিল। দুষ্টু বাঘ হাসতে হাসতে বাইরে এল। তারপর বলল, ওরে বোকা, আমি তোকে খাব। আমার পেটে ভীষণ খিদে।
বাঘের কথা শুনে লোকটা ভয় পেয়ে গেল। দৌড় দিয়ে পালাবে তারও উপায় নেই। সে কাঁদ-কাঁদ হয়ে বলল, আমি তোমার উপকার করলাম, আর তুমি আমাকে খেতে চাও। এমন কাজ কেউ কখনও করে?
লোকটার মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল। সে বাঘকে বলল, চল, দু জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসা করি। তারা কী বলে?
বাঘ রাজি হল। বাঘ বলল, সাক্ষীরা যদি আমার কথাতে সায় দেয় তা হলে আমি তোমাকে খাব। আর যদি সায় না দেয় তবে তোমাকে ছেড়ে দেব।
বাঘ আর লোকটা তখন সাক্ষীর খোঁজে হাঁটতে লাগল। যেতে যেতে একটা বটগাছের নিচে এল।
লোকটা বলল, এই বটগাছ আমার সাক্ষী।
বাঘ বলল, বটগাছকে জিজ্ঞাসা কর।
লোক॥ ও ভাই বটগাছ, তোমার তো অনেক বয়স হয়েছে, তুমি অনেক দেখেছ শুনেছ। বল তো দেখি, উপকার যে করে তার অপকার কি কেউ করে?
বট॥ হ্যাঁ, তাই তো সবাই করে। পথিক আমার ছায়ায় বসে ঠান্ডা হয়। আবার আমাকে খুঁচিয়ে আঠা বের করে। সেই আঠা রাখবার জন্য আমারই পাতা ছিঁড়ে নেয়। যাবার সময় ডাল ভেঙে নিয়ে যায়।
বাঘ॥ কি, হল তো! এবার আমি তোমাকে খাব।
লোক॥ আর একটু সবুর কর। আর এক জন সাক্ষী বাকি আছে।
আবার দু জন হাঁটতে শুরু করল। পথে এক শিয়াল যাচ্ছিল। শিয়ালকে দেখে লোকটা বলল, ঐ শিয়াল আমার সাক্ষী। শিয়ালকে ডেকে বলল, ও শিয়াল ভাই, একটু দাঁড়াও। বল তো, ভাল যে করে তার মন্দ কি কেউ কখনও করে?
চালাক শিয়াল বুঝল, নিশ্চয়ই কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। সে দূরে দাঁড়িয়েই বলল, কার ভাল আর কার মন্দ বলতে পারব না। আগে পুরো ঘটনা জানতে হবে। লোকটি বলল, এই বাঘ খাঁচার মধ্যে ছিল আর আমি পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম—
শিয়াল আড়চোখে দেখল, বাঘ মিটমিট করে হাসছে। শিয়াল বুঝে নিল ঘটনাটি কি ঘটেছে। কিন্তু চালাকি করে বলল, খাঁচা আর পথ নিজে চোখে না দেখলে আমি কিছুই বলতে পারব না।
বাঘ, শিয়াল আর লোকটি সেই খাঁচার কাছে এল। শিয়াল তখন বলল, খাঁচা আর পথ বুঝতে পেরেছি। এখন কি হয়েছে তাড়াতাড়ি বল।
লোক॥ বাঘ খাঁচার মধ্যে ছিল আর আমি পথ ধরে যাচ্ছিলাম।
শিয়াল॥ আস্তে আস্তে বল, বুঝে নিই ঘটনাটা। একটা পথ ছিল খাঁচার মধ্যে। আর সেই পথের মধ্যে বাঘ খাঁচা নিয়ে যাচ্ছিল।
শিয়ালের আবোল-তাবোল কথা শুনে বাঘ হো হো করে হেসে উঠল। বাঘ বলল, ওরে বোকা শিয়াল, আমি খাঁচার ভেতরে ছিলাম। লোকটি যাচ্ছিল পথ ধরে।
শিয়াল॥ বুঝতে পেরেছি। লোকটি খাঁচার ভেতরে ছিল, তুমি ছিলে পথের ধারে, তাই না?
বাঘ তখন রেগেমেগে আগুন। সে শিয়ালকে এক ধমক দিয়ে বলল, কি এমন শক্ত কথা যে বুঝতে পারিস না। আজ তোকে বুঝিয়ে ছাড়ব। এই বলে বাঘ এক লাফে খাঁচার মধ্যে ঢুকে পড়ল। তারপর বলল, তবে দেখে নে, আমি খাঁচার ভেতরে ছিলাম। ঐ লোকটি ছিল বাইরে।
শিয়াল তড়িঘড়ি করে খাঁচার দরজা বন্ধ করে দিল। দরজা এঁটে দিয়ে বলল, আর এভাবে হুকো দিয়ে দরজা বন্ধ ছিল।
বাঘ॥ হাঁ, হাঁ, হাঁ। এখন বুঝতে পেরেছিস।
শিয়াল॥ হাঁ, খুব বুঝেছি। চমৎকার বুঝেছি।
বাঘ॥ এবার দরজা খোল, বের হব।
শিয়াল খিল খিল করে হেসে উঠল। তারপর লোকটিকে বলল, এবার পালাও। আর কখনও দুষ্টু বাঘের উপকার করতে এসো না।
শিয়াল আর লোকটি যে যার ঘরে চলে গেল। আর দুষ্টু বাঘ খাঁচার মধ্যে রাগে গর গর করতে লাগল।






