কতটা জমি দরকার – লিও টলস্টয়

আট

আজ পাখমের স্বপ্ন সফল হওয়ার দিন। সকলের সঙ্গে সে যাত্রা শুরু করল। কেউ গেল ঘােড়ায় চড়ে, কেউ গেল গাড়িতে। খােলা প্রান্তরের মাঝে একটা ছােট পাহাড়ের দিকে সবাই এগিয়ে চলল। এখানে সবাই এসে পৌঁছালে সর্দার পাখমের কাছে এসে চারদিকে হাত ঘুরিয়ে বলল, ‘এই যে, তােমার সামনে যতদূর দেখতে পাচ্ছ সবটা আমাদের জমি। এই জমির যে কোনাে অংশ তুমি পছন্দ করে নিতে পারাে।’ পাখমের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সামনে অফুরন্ত জমি। সমস্ত জমি বুকসমান ঘাসে ভর্তি, আর হাতের তালুর মতাে সমতল। এই জমি কেউ কোনােদিন চাষ করেনি। উহু, কী চমৎকার জমি!

সর্দার তার মাথার টুপিখানা খুলে পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে রেখে বললেন, ‘এই হল তােমার চিহ্ন। এখানে থেকে তুমি যাত্রা শুরু করবে আবার এখানেই ফিরে আসবে। যতটা জমি ঘুরে আসতে পারবে সবটাই তােমার।’

পাখম নােটগুলাে বের করে টুপিটার মধ্যে রাখল। গায়ের কোর্টটা খুলে কোমরের বেল্ট শক্ত করে বেঁধে নিল। রুটি-ভরা একটা ঝােলা রাখল জামার নিচে আর বেল্টের সঙ্গে বাধল একটা পানির বােতল। তারপর জুতাের ফিতে বেঁধে নিল ভালাে করে। এসব হয়ে গেলে সে রওনা দেবার আগে দাড়িয়ে ভাবল, ‘কোন্ দিকে যাব? সবদিকে ভালাে জমি!’ আপন মনে আবার বলে উঠল যেদিকেই যাই না কেন—কিছু যায় আসে না। বরং আমি হাঁটব সূর্যোদয়ের দিকে। কাজেই সে পূর্বদিকে চেয়ে সূর্য ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

মনে মনে ভাবল, এতটুকু সময় আমি নষ্ট করব না। বাতাস ঠাণ্ডা থাকতেই আমাকে সবচেয়ে বেশি পথ হেঁটে নিতে হবে।

তখন সর্দারের লােকেরা ঘােড়ার পিঠে বসে পাখমের সামনে এসে দাঁড়াল। পুব আকাশে সূর্য যেই উকি দিয়েছে অমনি পাখম এগিয়ে চলল সামনের দিকে।

প্রথমে সে খুব স্বাভাবিকভাবে চলতে লাগল। প্রায় হাজারখানেক গজ গিয়ে থামল সে। একটা খুঁটি পোঁতা হল। তারপর আবার চলতে লাগল। আস্তে-আস্তে লম্বা পা ফেলে সে হাঁটার গতি দিল বাড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর থেমে আরেকটি খুঁটি পোঁতা হল।

পাখম এবার পেছনের দিকে তাকাল। পাহাড়ের উপর লােকজন দাড়িয়ে আছে। সূর্যের আলােতে তাদের সবাইকে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। পাখম অনুমান করল, মাইল-তিনেক পথ সে ছাড়িয়ে এসেছে। একটু একটু গরম লাগছে তার। গায়ের জামাটা খুলে সে বেল্টের সঙ্গে বেঁধে নিল। আরাে মাইল-তিনেক হাঁটার পর থামল সে। এখন সূর্যের তেজটা বেশ গায়ে লাগছে। আকাশের দিকে তাকাল আবার। নাস্তা খাওয়ার কথা মনে পড়েছে। মনে মনে হিশেব করে দেখল, এতক্ষণে দিনের মাত্র চারভাগের একভাগ সময় ব্যয় হয়েছে। এখনই মােড় ফেরাবার দরকার নেই। পায়ের জুতােজোড়া খুলে নিলে বােধহয় হাঁটতে সুবিধে হবে। এই ভেবে সে জুতাে খুলে বেল্টের সঙ্গে বেঁধে আবার হাঁটতে শুরু করল। ভাবল, আরাে মাইল-তিনেক পার হয়ে তারপর বা-দিকে মােড় ফিরব। এই জমিটা খুবই ভালাে মনে হচ্ছে। এরকম জমি ছেড়ে যাওয়া বােকামি হবে। কাজেই আরাে কিছুক্ষণ এগিয়ে গিয়ে পাখম পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল সেই পাহাড়টা প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। উপরের লােকগুলােকে দেখাচ্ছে ছােট ছােট পিঁপড়ের মতাে।

এবার পাখমের মনে ফেরার চিন্তা এল। মনে হল বেড়টা বেশ বড়ই হয়েছে—আর নয়। এবার ফিরতে হবে। ঘাম ঝরছে শরীরে। তেষ্টাও পেয়েছে খুব।

সেখানে আরেকটা খুঁটি পোতা হল। বােতল থেকে তৃপ্তিমতাে পানি খেয়ে বাঁ-দিকে মােড় ঘুরে চলতে লাগল। এখানে মানুষ-সমান উচু ঘাস, আর সূর্যের তেজও প্রবল। আস্তে আস্তে পাখমের ক্লান্তি বােধ হতে লাগল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝল, দুপুর হয়ে গেছে। এখন একটু বিশ্রাম নিতে হবে।

কিন্তু দাড়িয়ে দাড়িয়েই পাখম খানিকটা রুটি খেল এখানে, সঙ্গে সঙ্গে পানি খেয়ে শুকনাে মুখটা ভিজিয়ে নিল। পাখম বসল না। তার ভাবনা হল, একবার বসলেই শুতে ইচ্ছে করবে, আর এই ক্লান্ত শরীরে একটু শুলেই সে ঘুমিয়ে পড়বে। কাজেই ওভাবে দাড়িয়ে দাড়িয়ে খানিক বিশ্রামের পর পাখম আবার চলতে শুরু করল। প্রথমদিকে তার হাঁটতে তেমন অসুবিধা হল না, খাবার খেয়ে সে শরীরে কিছুটা হলেও জোর ফিরে পেয়েছিল। অথচ ওদিকে সূর্য আরাে প্রখর হয়ে উঠেছে, একটু হেলেও গেছে পশ্চিমের দিকে। গরমে তার শরীর ভেঙে পড়তে চাইছে, যেন দেহটা এবার অবশ হয়ে যাবে। কিন্তু থামলে চলবে না। এখন একটা ঘন্টা কষ্ট করলে বাকি জীবনটা সুখ আর ঐশ্বর্যে ভরে উঠবে।

হাঁটার পথটাকে গােলাকার রেখে মাইল-ছয়েক হাঁটার পর বা-দিকে বাক নেবে, গন্তব্যের কাছাকাছি চলে যাবে—ঠিক এমনি সময় পাখমের চোখে পড়ল একটু ভেজা-ভেজা সুন্দর একটুকরাে জমি। এটুকু ছেড়ে গেলে সারাজীবন দুঃখ রয়ে যাবে। নাহ, কখনাে এ-জমি ছেড়ে যাওয়া যায় না! কাজেই বেশ অনেকটা পথ হেঁটে সে পুরাে জলা জায়গাটা ঘুরে এল। একটা খুঁটি পুঁতে পাহাড়ের দিকে তাকাল; লােকগুলাে একেবারে অস্পষ্ট হয়ে গেছে, ওই পথ সাত-আট মাইলের কম হবে না।

পাখমের মনে হল ; জমির পাশগুলাে অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন কোণা বরাবর হেঁটে পথ সংক্ষিপ্ত করতে হবে। কাজেই এবার সে খুব তাড়াতাড়ি পা ফেলতে লাগল। সূর্য অনেকখানি হেলে পড়েছে। এদিকে চারকোণা জমির তৃতীয় লাইনের অর্ধেকও সে ছাড়াতে পারেনি। পাহাড় এখনাে দশমাইলের কম হবে না।

নাহ, জমিটার আকার যদিও তেকোণার মতাে হয়ে যাচ্ছে, তবুও এভাবেই হাঁটতে হবে। আমার অনেক জমি হয়ে গেছে। পথে আশপাশের নতুন জমি নেবার আর কোনাে চেষ্টা করব না। তাড়াতাড়ি একটা গর্ত করে পাখম সােজা এগিয়ে চলল পাহাড়ের দিকে।

donate