রিপভ্যান উইংকল – ফখরুজ্জামান চৌধুরী

কতক্ষণ সবাই চুপ থাকার পর এক অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি সরু গলায় জবাব দিল, ‘সে তো আঠারো বছর আগে মারা গেছে।’

‘ব্রম ডুচার কোথায়?’

‘সে তো যুদ্ধ শুরু হতেই সৈন্যদলে যোগ দিয়ে চলে গেছে এবং মারাও গেছে বলে আমরা জেনেছি।’

‘স্কুল মাস্টার ভ্যান বুশেল কোথায়?’

‘সেও যুদ্ধে গিয়েছিল। সেখানে সে বড় পদও পায়। এখন সে একজন কংগ্রেসি।’

বন্ধুদের এরকম পরিবর্তন ও পৃথিবীতে তাকে একা দেখে রিপের হৃদয় দমে গেল। প্রতিটা উত্তর আর দৃশ্যই তাকে হতভম্ব করতে লাগল। এমতাবস্থায় হ্যাট-পরা লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু তুমি কে?’

‘খোদা জানেন’, রিপ কেঁদে উঠল, ‘আমি আর আমি নেই। আমি অন্য কেউ। তা না হলে এক রাতের ব্যবধানে কী এত পরিবর্তন আসে? আমি পাহাড়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পাহাড়িরা আমার বন্দুক বদলে দিয়েছে।’

উপস্থিত লোকদের কেউ কেউ মাথা ঝাঁকাতে লাগল। একজন ছোঁ মেরে বন্দুকটা কেড়ে নিল। ছুড়ি আর টুপিওয়ালা লোকটা গোলমাল আন্দাজ করে দ্রুত সরে পড়ল।

ঠিক তখন ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল ফিটফাট একজন মহিলা ছাইরঙের বৃদ্ধলোকটাকে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তার কোলে একটি শিশু। শিশুটা ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করলে মহিলাটি বলল, ‘এই রিপ থাম্, ও তোকে কিছু করবে না।’ শিশুটির নাম ও তার মায়ের কণ্ঠস্বর রিপের মনে পুরাতন স্মৃতি জাগিয়ে দিল।’ তোমার নাম কী গো?’ জিজ্ঞেস করল সে।

‘জুনিথ গার্ডনার’।

‘বাপের নাম?’

‘আহা, তাঁর নাম ছিল রিপভ্যান উইংকল। কিন্তু আজ থেকে বিশ বছর আগে সেই যে তিনি বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, আর ফেরেননি। তার কুকুরটা একা একা ফিরে এসেছে। তিনি কি বন্দুক নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন না ইন্ডিয়ানরা তাঁকে মেরে ফেলেছেন কেউ তা বলতে পারে না। তখন আমি এতটুকুন ছিলাম।’

রিপের তখন আর একটা কথা জিজ্ঞেস করা বাকি।

‘তোমার মা কোথায়?’

‘আহা, তিনিও কদিন আগে মারা গেছেন।’

এবার রিপ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার মেয়ে আর নাতিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি তোমার বাবা। একসময়ের যুবক রিপভ্যান উইংকল আজ হাড্ডিসার বুড়ো।’

সবাই তো একদম অবাক। ভিড় ঠেলে এক বুড়ি এসে ভুরুর ওপর হাত রেখে বলল, ‘সত্যি! রিপভ্যান উইংকলই বটে। বুড়ো প্রতিবেশী, এসো এসো,বিশ বছর কোথায় ছিলে?’

রিপ তার কাহিনী বলল। দীর্ঘ বিশ বছর তার কাছে এক রাত্রি মোটে! এমন তাজ্জব কথা কে শুনেছে কবে।

পিটার হলো এখানকার পুরোনো অধিবাসী এবং এখানকার লোকদের সম্বন্ধে তার পুরো জ্ঞান। সে রিপের কথাগুলো বিশ্বাস করল; সে আরও বলল যে, তার বংশের ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, ক্যাট্‌সকিল পাহাড়ে অদ্ভুত ধরনের লোক সত্যি আছে। তারা নাকি উন্মুক্ত খাদে খেলা করে বেড়ায় এবং পাহাড়ের মধ্যে বাজের মতো শব্দও শোনা যায়।

রিপভ্যান উইংকল আর কিছুই নয়-সেই ঐতিহাসিকদের কথা প্রমাণ করে এলেন মাত্র।


পোস্টটি শেয়ার করুন