জামাল স্যার – স্মৃতিতে অম্লান

মির্জানগর তৌহিদ একাডেমী এর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জামাল স্যার আজ আর আমাদের মাঝে নেই, ব্রেইন স্ট্রোক এ আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত ৬ আগস্ট, ২০২০ তারিখ তিনি আমাদের মাঝ থেকে চির বিদায় নিয়েছেন।। আল্লাহ স্যারকে জান্নাতবাসী করুন… আমিন

স্যারের এই বিপদের সময়ে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের স্যারের পাশে দাড়ানোর সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী (মির্জানগর তৌহিদ একাডেমী) গ্রুপ কর্তৃক পরিচালতি হয়েছিল গুরুদক্ষিণা সংগ্রহ কার্যক্রম। এটা কোন সাহায্য, সহযোগিতা বা অনুদান সংগ্রহ ইভেন্ট ছিল না, এটা একজন শিক্ষকের সম্মানে তার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের ‘গুরুদক্ষিণা’। স্যারের ছাত্ররা আজ একেকজন একেক জায়গায় অবস্থান করছি, তাই চাইলেও সবাই কিছু ফ্রুটস নিয়ে স্যারকে একবার দেখে আসার সুযোগ ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম সবার প্রতিনিধি হিসেবে এই কাজটি করতে। এই সামান্য গুরুদক্ষিনা স্যারের কাছে তার সন্তানতূল্য ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসার নিদর্শন হয়ে থাকবে সারাজীবন। যেখানে আপনাদের সাড়াও পেয়েছিলাম আশাতীত। আমাদের সেই কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত কিছু কথা-

২৫ জুলাই, ২০২০ তারিখে আমরা সর্ব প্রথম স্যারের অসুস্থতার খবর জানতে পারি ফেসবুকে এবং অনুদান সংগ্রহের প্রস্তাবটি আমাদের নিকট সর্বপ্রথম উপস্থাপন করেন স্কুলের সম্মানিত শিক্ষক ‘গফুর স্যার’। গফুর স্যার ফান্ড সংগ্রহের বিষয়ে জামাল স্যারের পরিবারের অনুমতি, চিকিৎসা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মূল্যবান সময় ও শ্রম দিয়েছেন। যার জন্য আমরা স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা ৫০ হাজার টাকার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২৯ জুলাই, ২০২০ খ্রিঃ তারিখ সকাল ১০:১৫ মি. এর সময় গুরুদক্ষিণা সংগ্রহ কার্যক্রমের ঘোষনা করি, যার সময়সীমা নির্ধারণ করেছিলাম ৩১ জুলাই, ২০২০ তারিখ রাত ১১:৫৯ মি. পর্যন্ত। কিন্তু সকলের আন্তরিক আলোবাসায় আমাদের নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ায় আমরা ৩০ জুলাই, ২০২০ তারিখ সকাল ১০.২৯ মি. এর সময় কালেকশন বন্ধ ঘোষনা করার পরও আমাদের সর্বশেষ কালেকশন গিয়ে দাঁড়ায় ৭২,৬৬৫/- টাকাতে।

যেহেতু নির্ধারিত সময়ের আগেই ইভেন্ট ক্লোজ হয়ে গেছে, তাই আমরা কালক্ষেপন না করে কোরবানীর ঈদের আগেরদিন (৩১ জুলাই, ২০২০) এডমিন প্যানেলের একটি প্রতিনিধিদল গফুর স্যারের প্রতিনিধিত্বে জামাল স্যারের সাথে সরাসরি দেখা করেন এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় খোঁজখবর নেন, যেখানে গণমাধ্যমকর্মী স্কুলের প্রাক্তনছাত্র এম. এ. হাসানও উপস্থিত ছিলেন। যাওয়ার সময় তারা স্যারের জন্য কিছু ঈদ উপহার ও ফ্রুটস নিয়ে যান।

স্যারের পারিবারিক বিভিন্ন জটিলতার কারনে নগদ টাকা স্যারের পরিবারের হাতে নগদ টাকা হস্তান্তর না করে, স্কুলের আরও দু-একজন শিক্ষক ও কয়েকজন শুভাকাঙ্খীর পরামর্শক্রমে পরিবারের সম্মতিতে চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম গফুর স্যার মনিটরিং করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। যার কারনে সংগৃহীত টাকা হতে অবশিষ্ট মোট ৬৫,৬০০/- টাকা দিয়ে জামাল স্যারের চিকিৎসা তহবিল গঠন করা হয় এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে গফুর স্যারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে।  উল্লেখ্য যে, সংগৃহীত অনুদান হতে ‌বিকাশ ক্যাশ আউট চার্জ, যাতায়াত, স্যারকে দেখতে যাওয়ার সময় কেনাকাটা যেমন: চার্জার ফ্যান, পাঞ্জাবি, পায়জামা, গেঞ্জি, ফ্রুটস ইত্যাদি বাবদ ৭০৬৫ টাকা খরচ হয়েছে।

গফুর স্যার কিভাবে জামাল স্যারের চিকিৎসা নতুন করে শুরু করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শের জন্য ঈদের পরের দিনই (২ আগস্ট, ২০২০) পূর্বের ডাক্তারদের ব্যবস্থাপত্রসহ যাবতীয় কাগজপত্র নিয়ে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ও এডমিন প্যানেলের অন্যতম সদস্য ডা. আজিজুর রহমান মজুমদার (ফেনী সদর হাসপাতাল) এর সাথে দেখা করেন। আজিজ ভাই জামাল স্যারের সকল মেডিকেল হিষ্ট্রি দেখে সম্ভব হলে স্যারকে দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তর অথবা ফেনী আল কেমী হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেশ।

গফুর স্যার টানা দুই তিনদিন ফেনীতে অবস্থান করেও জামাল স্যারের পরিবারের পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে স্যারকে হাসপাতালে ভর্তি করতে ব্যর্থ হন। গফুর স্যার ফেনী থেকে চলে আসার পরের দিন ভোরে (৬ আগস্ট, ২০২০ সকাল ৭.৩০মি)  জামাল স্যারের শারারিক অবস্থার অবনতি ঘটলে পরিবারের পক্ষ থেকে কারও সাথে যোগাযোগ ছাড়াই জামাল স্যারকে ফেনী আল কেমী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে পৌঁছানোর পর গফুর স্যারকে ফোন করেন। স্যারের শারারিক অবস্থা বিবেচনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে ভর্তিতে অপারগতা প্রকাশ করলেও ডাঃ আজিজুর রহমান মজুমদারের হস্তক্ষেপে ভর্তির অনুমতি পাওয়া যায়। কিন্তু, পরিবারের পক্ষ থেকে কেন ভর্তি না করিয়ে সকাল ৮.৩০মি. এর মধ্যেই স্যারকে পুনরায় পরশুরামের বাসায় ফেরত নিয়ে আসা হয় তা বুঝতে পারিনি। সেদিন বিকাল সাড়ে তিনটার দিকেই স্যার আর কাউকে কষ্ট না দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। হয়তো সৃষ্টিকর্তাও চাননি মানুষটা এতটা কষ্ট পাক।

চিকিৎসা ব্যয় বাবদ গঠিত তহবিল হতে স্যারের দাফন-কাফন-এম্বুলেন্স ইত্যাদি খরচ বাবদ আরও ১৫ হাজার টাকা স্যারের পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ১০ হাজার টাকা দিয়ে স্যারের একজন পাওনাদারের ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, যা স্যার জীবদ্দশায় গ্রহণ করেছিলেন।

তহবিলের অবশিষ্ট টাকা এখনও পর্যন্ত স্যারের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি, যা গফুর স্যারের নিকট রয়েছে। চেষ্টা করা হচ্ছে- উক্ত টাকারও যেন যথাযথ ব্যবহার হয় সেটা নিশ্চিত করার।

আমাদের স্কুলের ইতিহাসে এটাই হয়তো প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের সমন্বিতভাবে কিছু করার প্রথম প্রয়াস, তাও আবার একজন শিক্ষকের জন্য। হয়তো এবার আমাদের উদ্যোগ স্যারকে বাঁচাতে পারেনি, তবে এমন একটা উদ্যোগের শুরুটা দেখে যেতে পেরেছেন স্যার… দেখে যেতে পেরেছেন তাঁর সন্তানরা তাকে ভুলে যায়নি। আমাদের বিশ্বাস ভবিষ্যত প্রজন্ম হয়তো এ উদ্যোগ থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারবে।


কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই

কেন শেষ মুহুর্তে উদ্যোগ নিয়েছি, আরও আগে করা যেত না?

  • স্যারের শারারিক কন্ডিশন সম্পর্কে পূর্বে আমরা কেউই অবহিত ছিলাম না, মূলত ২৫ জুলাই, ২০২০ তারিখে ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমেই বিষয়টি সবার নজরে আসে। বিষয়টি নজরে আসার পর সকল খোঁজ খবর নিয়ে পরিবারের অনুমতি নিয়ে সবার সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই উদ্যোগটি নেওয়া হয়।

স্যারের শারারিক কন্ডিশন চিকিৎসার যোগ্য ছিল না, তারপরও ইভেন্ট করে কি লাভ?

  • আমরা আসলে লাভ ক্ষতি বিবেচনা করিনি, প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে স্যারের পাশে দাড়াতে চেষ্টা করেছি। এটা কোন সাহায্য, সহযোগিতা বা অনুদান সংগ্রহ ইভেন্ট ছিল না, এটা একজন শিক্ষকের সম্মানে তার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের ‘গুরুদক্ষিণা’। স্যারের ছাত্ররা আজ একেকজন একেক জায়গায় অবস্থান করছি, তাই চাইলেও সবাই কিছু ফ্রুটস নিয়ে স্যারকে একবার দেখে আসার সুযোগ ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম সবার প্রতিনিধি হয়ে এই কাজটি করতে। তাই এখানে লাভ-ক্ষতির প্রশ্ন আসছে না।

স্যারের জন্য সংগৃহীত ফান্ড কেন স্যারের পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি?

  • এতদিনে হয়তো আমরা সবাই স্যারের পারিবারিক বিভিন্ন জটিলতার বিষয়টি মোটামুটি অবগত হয়েছি। আমরা স্যারের সম্মানে ওনার ব্যক্তিগত জীবন পাবলিকপ্লেসে পর্যালোচনা হোক সেটা চাইনা, তাই এ বিষয়ে পাবলিকলি বিস্তারিত বলতে পারছিনা। আমরা চেষ্টা করেছি স্যারের টাকাটা যেন স্যারের কাজেই ব্যয় হয় সেটা নিশ্চিত করতে।