এদিকে নকল রাজকুমার টম বিচার ও অন্যান্য রাজকার্য সমাধা করে যাচ্ছে। আর সত্যিকার রাজকুমার লন্ডন ব্রিজের দিকে তার রাজপ্রাসাদের কারো সঙ্গে দেখা হবে এই আশায় সেদিকে চলেছে। হঠাৎ রাজকুমারের কানে আসল, তোমার রক্ষক বন্ধু তোমাকে আর আজ রক্ষা করার জন্য আসছে না। রাজকুমার বলল, এটা কোন ধরনের ধূর্ততা! তখন জন ক্যান্টি চাবুক হাতে এগিয়ে এসে বলল, নিশ্চয়ই তুমি তোমার বাবাকে চিনতে ভুল করোনি। এখন এই গুদামঘরের ভিতর ঢোকো এবং যতদিন পর্যন্ত আমার জন্য ভিক্ষা করতে রাজি না হবে এখানেই তোমাকে কাটাতে হবে। এদিকে সেই সৈনিক পইপই করে রাজকুমারকে খুঁজছে। পরে সে অনুমান করল যে সেই বদমাইশ লোকটা যে তাকে ছেলেটির বাবা বলে পরিচয় দিতে চেষ্টা করেছিল নিশ্চয়ই সে তাকে কোথাও আটকে রেখেছে। ভীত ও সন্ত্রস্ত রাজকুমার পুরাতন গুদামের মধ্যে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
হঠাৎ রাতে যখন তার ঘুম ভাঙল তখন সে দেখল কয়েকজন চোরের এক সভা বসেছে। তারা সবাই চুরির জন্য নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবনে ব্যস্ত। রাজকুমারের দিকে চোখ পড়তেই তাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে তার মাথায় এক ছেঁড়া টুপি পরিয়ে দলের মাতবর বলল, আমি তোমাকে ফুফু দি ফাস্ট নামে নামকরণ করলাম। পরের দিন ভোরে রাজকুমার ও তার সঙ্গী ছেলেটি ভিক্ষা করতে বের হলো। রাজকুমারকে ছেলেটি বলল, তুমি আমাকে হিউগস বলে ডাকতে পারো। রাজকুমার বলল, কিন্তু আমি তোমার মতো ভিক্ষা করতে পারব না। হিউগস বলল, তুমি এত সাধু হলে কবে থেকে? তোমার বাবা যে বলল, তুমি গত জীবনে লন্ডনে ভিক্ষা করে কাটিয়েছ? রাজকুমার বলল, ঐ বদমাইশটা আমার বাবা নয়। এমন সময় হিউগস বলল, শীঘ্র এদিকে আসো একজন ধনীলোক এদিকে আসছে। তোমাকে ভিক্ষা করতে হবে না। তুমি শুধু ভান করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর আমি মাটির উপর শুয়ে অজ্ঞান হবার ভান করব। যখন ধনী লোকটি তোমার সামনের দিকে আসবে তখন হৈ-চৈ করে চিৎকার করে বলবে যে আমি তোমার ভাই এবং আমরা কয়েকদিন কিছুই খাইনি। তারপর ছেলেটি রাজকুমারকে শাসিয়ে বলল, ঠিকমতো যদি কথা না শোনো তাহলে তোমার শরীরের হাড়গুলো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করব।
ধনী ভদ্রলোকটি হিউগ্সের কাছে এসে তাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কী হয়েছে? তখন সে বলল, আমি এক গরিব ছেলে, অনাহারে ভুগছি, আমাকে দয়া করে একটা পয়সা দিয়ে সাহায্য কর লোকটি বলল, আহা গরিব বেচারা, তোমায় একটা কেন তিনটা পয়সা দিয়ে সাহায্য করব। ছেলেটি বলল, জনাব দয়া করে যদি আমাকে একটু ধরে ধরে আমার বাড়ি পৌঁছে দেন। এমনি সময় রাজকুমার চিৎকার করে উঠল, ও আমার ভাই নয়, সে একজন ভিক্ষুক ও চোর, আপনি লক্ষ করলে দেখতে পাবেন যে, সে আপনার পকেট কেটেছে। আপনার লাঠির এক বাড়িতে ওর সব ভান পালাবে। একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হিউগ্স দৌড়ে পালাল।
রাজকুমার সুযোগ খুঁজছিল। সে ভাবল এখন যদি আমি না পালিয়ে যাই তাহলে হিউগ্স ভিক্ষুকদের নিয়ে এসে আমায় তাড়া করবে। সে সমস্তটা দিন কৃষকদের জমির চারিদিক দিয়ে ঘুরে বেড়াল। সন্ধ্যার দিকে এক বনের ধারে এসে হাজির হলো। এখানে দূরে একটা কুটিরে আলো জ্বলতে দেখে সে সেখানে গিয়ে হাজির হলো। এই কুটিরটা ছিল একজন ঋষিতুল্য সন্ন্যাসী। রাজকুমার ভিতরে গিয়ে পরিচয় দিল যে সে ইংল্যান্ডের রাজা। কুটিরের ভিতরের সন্ন্যাসী বলল, আসো ভিতরে আসো। আমার এখানে কাউকে জায়গা দিই না, তবে রাজার জন্য নিশ্চয়ই আমার জায়গা আছে। রাজকুমারকে সম্বোধন করে সন্ন্যাসী বলল, আমার তোমাকে বিচার করার কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি তোমাকে একটি গোপন তথ্য বলব, আমি সন্ন্যাসী নই। আমি হলাম একজন ফেরেস্তা। তুমি তাহলে হেনরির ছেলে, সে কী বেঁচে আছে? রাজকুমার বলল, না কিছুক্ষণ আগে তার মৃত্যু হয়েছে।
সন্ন্যাসী তাকে খাইয়ে দাইয়ে বিছানায় ঘুমোতে দিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে সন্ন্যাসী এসে তাকে বলতে লাগল, তুমি তো জানো না তোমার বাবা আমার ওপর অত্যাচার করেছে। আমাকে ধর্ম থেকে বিতাড়িত করেছে। আমাকে ও আমার অনুসারীদের দেশ থেকে তাড়িয়েছে। এই জঙ্গলে আমি পালিয়ে আছি। যখন বুঝতে পারল যে রাজকুমার ঘুমিয়ে তখন সে বলল, যতক্ষণ বেঁচে আছ সুখস্বপ্ন দেখে নাও। এই বলে সে বড় পাথরে ছুরি শান দিতে লাগল আর বলতে লাগল, তোমার বাবা আমার হাত থেকে বেঁচে গেছে, তুমি বাঁচবে না। তারপর সে তার হাত পা ও মুখ দড়ি ও কাপড় দিয়ে বাঁধল। তারপর সন্ন্যাসী যেইমাত্র ছুরি উঁচিয়ে রাজকুমারকে হত্যা করতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় কে যেন কড়া নেড়ে জিজ্ঞাসা করল, বাসায় কে আছে? রাজকুমার সেই স্বর শুনে ভাবল, এ তো সেই সৈনিক বন্ধুর গলা। সন্ন্যাসী দরজা খুলে দিতেই সৈনিক জিজ্ঞাসা করল, ছেলেটি কোথায়? সন্ন্যাসী বলল, কোন ছেলে? তখন সৈনিক রেগে গিয়ে বলল, যে ছেলেটা চুরি করেছিল তাকে আমি শাস্তি দিয়েছি। এখন তোমার এখানে যে এসেছে সে ছেলেটি কোথায়?
সন্ন্যাসী প্রথমে নানা কথা বলে তাকে ফাঁকি দিতে চাইল। কিন্তু সৈনিকের চাপের মুখে সন্ন্যাসী রাজকুমারকে সৈনিকের হাতে তুলে দিল। সৈনিক তখন সেই কেনা পোশাক রাজকুমারকে পরিয়ে গ্রাম থেকে দুটি গাধা কিনে এনে তাতে চড়ে শহরের দিকে রওনা হলো।
শহরে হেনডেন হলে এসে তারা পৌঁছল। এই হেনডেন হলটা ছিল সৈনিকের বাড়ি। সৈনিক বাড়ির কড়া নাড়তেই তার ভাই বেরিয়ে আসল। সৈনিক তখন বলল, আরে আমার ভাই। উহ্! প্রায় সাত বছর পরে তোমার সঙ্গে দেখা। কিন্তু তার ভাই তাকে না চেনার ভান করে বলল, আপনি কে? সৈনিক বলল, আমি তোমার ভাই মিল। তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ না? তখন তার ভাই বলল, আমার ভাই! সে তো কবে প্রায় তিন বছর হলো যুদ্ধে মারা গেছে। তুমি একজন জালিয়াত। সৈনিক বলল, তুমি মিথ্যা বলছ। ঠিক আছে তোমার বাবাকে ডাকো। বাবা মারা গেছেন। উহ্! বড় দুঃখের সংবাদ, তাহলে লেডি এডিথকে ডাকো। কিছুক্ষণ পরে সৈনিকের ভাই এক সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে হাজির হলো ও জিজ্ঞাসা করল, বলো তো এই লোকটাকে তুমি চেনো কী না? লেডি এডিথ বলল, এ লোকটাকে জীবনে আমি কখনো দেখিনি। সৈনিক রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলল, বদমাইশ, মিথ্যুক, তুমি নিজে চিঠি লিখে জানিয়েছ যে আমি মরে গেছি এবং তারপর আমার বাগদত্তাকে বিয়ে করেছ। আমার সামনে থেকে দূর হও, নচেৎ তোমায় আমি হত্যা করব। এই বলে তার ভাইকে আক্রমণ করল।
আক্রান্ত ভাইয়ের চিৎকারে সব চাকর এসে হাজির। তখন সৈনিকের ভাই হিউগ বলল, সব দরজা বন্ধ করে দাও যেন এই জালিয়াত পালাতে না পারে। সৈনিক বলল, আমি পালাচ্ছি না, যে পর্যন্ত আমি ন্যায়মতো হেনডন হলের উত্তরাধিকারী হচ্ছি। রাজকুমার বলল, সত্যি বড়ই আশ্চর্যের বিষয়। সৈনিক বলল, হিউগ ছোটবেলা থেকেই বদমাইশ আর জোচ্চোর স্বভাবের ছিল। রাজকুমার বলল, আমি ভাবছি যে আমাকে খোঁজার জন্য এখনো কোনো সৈন্য পাঠানো হলো না কেন? সৈনিক মনে মনে বলল, আহা! বেচারার রাজকীয় দুঃস্বপ্ন এখনও যায়নি। রাজকুমার বলল, আমি আমার সমস্ত ঘটনা এ কারণে লিখে রেখেছি। এটা তুমি আগামীকাল আমার চাচা লর্ড হাটফোর্ডের কাছে পৌঁছে দেবে। সৈনিক বলল, ঠিক আছে।