রিপভ্যান উইংকল – ফখরুজ্জামান চৌধুরী

রিপভ্যান উইংকল
– ফখরুজ্জামান চৌধুরী
[ওয়াশিংটন আরভিং রচিত ‘রিপভ্যান উইংকল’ অবলম্বনে]

হাডসন নদীর ওপর দিয়ে জাহাজে করে যারা গেছে তাদের সবারই দৃষ্টি কেড়েছে ক্যাটসাকিল পাহাড়গুলো। নদীর পশ্চিম দিকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এ পাহাড়শ্রেণি।

এসব রূপকথার পাহাড়ের নিচে আছে এক গ্রাম। অনেক বছর আগে সে গ্রামে বাস করত একজন লোক; নাম তার রিপভ্যান। উইংকল পরিবারের সদস্য বলে রিপভ্যান উইংকল নামেই সবার কাছে ছিল তার পরিচয়।

গ্রামের সবাই তাকে খুব ভালোবাসতেন। ছেলেরা তাকে পথে দেখলেই আনন্দে চিৎকার করে উঠত। খেলাধুলার ব্যাপারে ছেলেদের সে খুব সাহায্য করত, তাদের খেলার জিনিস বানিয়ে দিত, ঘুড়ি ওড়ানো শেখাত, মার্বেল খেলা শেখাত।

রিপের এই আড্ডাবাজ মনোভাব গ্রামের অলস বন্ধুরা মেনে নিলেও তার স্ত্রী কিন্তু মেনে নিল না। নিজের কোনো দোষ খুঁজে পায় না রিপ। দোষের মধ্যে শুধু সে কখনও বিশেষ কাজ করত না। পরিশ্রম বা অধ্যবসায়ের ভয়ে কিন্তু সে অমন করত না। কারণ প্রায়ই সে এক টুকরো ভিজে পাথরের ওপর বসে থাকত। হাতে থাকত ইয়া বড় এক লাঠি। শান্তশিষ্টভাবে বসে বসে সে মাছ ধরত। কিন্ত ভুলেও কোনো মাছ তার বড়শিতে ধরা পড়ত না। সে একটা ফাঁদ কাঁধে করে উঁচু পাহাড় আর বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াত কাঠবেড়ালি আর বুনো কবুতর ধরার জন্য। পাড়াপড়শির সবচেয়ে কঠিন কাজটাও সে করে দিত। ঢেঁকিতে ধান বানতে অথবা পাথরের প্রাচীর গড়তেও সে তাদের সাহায্য করত। এককথায় রিপভ্যান উইংকল অন্যের উপকার করে দেয়ার জন্য সবসময় রাজি থাকত।

রিপভ্যান উইংকলের ছেলেগুলো খুব বজ্জাত হয়ে উঠল। বাপের ছন্নছাড়া ভাব তাদেরকে আরও অলস হবার জন্য সাহসী করে তুলল। রিপভ্যানের তবুও জ্ঞান হলো না। নিজেও সরল জীবনযাপন কামনা করে। পরিশ্রম করে টাকা রোজগারের চেয়ে উপোস থাকাই যেন শ্রেয়।

রিপভ্যান উইংকল হেসে-খেলে জীবন কাটালেও তার স্ত্রী সবসময় আলসেমি আর অসাবধানতার জন্যে

ঘ্যানঘ্যান করত। পরিবারটাকে সে ধ্বংস করছে বলেও তাকে সে গাল দিত। রিপ শুধু কাঁধ দুলিয়ে, মাথা উঁচিয়ে, চোখ বন্ধ করে কোনো কথা না বলে তার জবাব দেয়। আর মাঝে মাঝে সে বাড়ির বাইরে চলে গিয়ে ঝগড়া লাগা বন্ধ করে।



রিপের একমাত্র পোষা প্রাণী ছিল তার কুকুর উলফ্। কুকুরটাও তার মনিবের মতোই রিপের স্ত্রীর কাছে অবজ্ঞা আর লাঞ্ছনা লাভ করত। স্ত্রী মনে করত, কুকুরটাই তার মনিবকে বেয়াড়া করে তুলেছে। কারণ কুকুরটাই ছিল রিপের একমাত্র ভ্রমণসঙ্গী। আর কুকুরটা যেন ভাবত, ‘বেচারা রিপ কর্ত্রী তোর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে? আমি বেঁচে থাকতে তোর বন্ধুর অভাব হবে না।’ উল্‌ফ্ হয়তো সমস্ত হৃদয় দিয়ে মনিবের দুঃখ বোঝার চেষ্টা করত।

শরৎকালের একদিন। রিপ ক্যাটসকিল পাহাড়ের একটা অংশে বসেছিল। বসে বসে সে কাঠবেড়ালি শিকার করছিল। বন্দুকের শব্দ পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ক্লান্ত হয়ে একসময় সে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। রিপ দেখল, নিচে তরতর করে বয়ে চলেছে হাডসন নদী। নদীর বুকে পড়েছে বেগুনি রঙের ছায়া।

রিপ উঠে নিচে নামতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ সে শুনতে পেল কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে। চারিদিকে তাকিয়ে সে কাউকে দেখতে পেল না। ভাবল, তার শোনার ভুল হতে পারে। কিন্তু আবারও শুনতে পেল সেই ডাক, ‘রিপভ্যান উইংকল’।

কুকুরটা ভয়ে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে মনিবের পাশে এসে দাঁড়াল। রিপের একটু ভয় হলো। সে তাকিয়ে দেখল, অদ্ভুত একটা লোক পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে আসছে। লোকটাকে রিপ চিনতে পারল না। হতে পারে কোনো সাহায্যপ্রার্থী, তাই রিপ এগিয়ে গেল লোকটার কাছে। লোকটা সত্যি অদ্ভুত আকৃতির। মাথায় একঝাঁক ভারী চুল, মুখে চকচকে দাড়ি। আর পোশক পুরোনো ওলন্দাজ ধাঁচের। কাপড়ের জামায় তার বুক ঢাকা। পরনে ব্রিচেস। ঢিলেঢালা ব্রিজেসের গায়ে বোতাম লাগানো, আর হাঁটুর দিকটা বেশ উঁচু। কাঁধে আর মদ-ভরা একটা ভান্ডা সে রিপকে কাছে এসে বোঝা নিয়ে সাহায্য করতে ইশারা করল।

বোঝা ভাগাভাগি করে তারা পাহাড় বেয়ে নেমে এল। রিপ শুনতে পেল পাহাড়ের মাঝে যেন বাজ ডাকছে। থমকে দাঁড়াল সে। কিন্তু সাহসে ভর করে আবার লোকটাকে অনুসরণ করল। ওরা কিছুক্ষণ পর উন্মুক্ত একটা খাদে এসে পৌঁছাল। উপরে গাছের ডালের ফাঁকে আকাশ আর মেঘ দেখা যায়।

এতক্ষণ পর্যন্ত রিপ আর তার সঙ্গী কোনো কথা না বলে পথ হাঁটছিল। লোকটা সম্বন্ধে রিপ নানা কথা ভাবতে লাগল।

পোস্টটি শেয়ার করুন