রাজকুমার ও ভিখারির ছেলে – মার্ক টোয়েন

রাজা ভাবলেন, বোধ হয় সে তার নিজের পরিচয় ভুলে গেছে। তাই পরীক্ষা করার জন্য ল্যাটিন ভাষায় প্রশ্ন করলেন। টম ঠিক ঠিক উত্তরই দিল। তখন রাজা মনে মনে ভাবলেন যে বেশি পড়াশুনা করার ধরুন তার এই অবস্থা হয়েছে। তাকে খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখতে হবে। সে হলো আমার একমাত্র উত্তরাধিকারী। আর কালই তার অভিষেক করতে হবে। রাজা যাকে কথাগুলো বলছিলেন তিনি বলে উঠলেন যে হুজুর আপনি কি ভুলে গেছেন নরফোকের ডিউক এখনো আপনার রাজনৈতিক বন্দি, তাকে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করার আদেশ দিয়েছেন। রাজা বললেন, সে আদেশ ঠিক থাকবে। ঠিক আছে হুজুর, বলে লোকটা বিদায় নিল।

সেদিন রাজকুমারের ঘরে বসে টম একা একা বিরক্ত হয়ে ওঠল নিজের ওপর। সে বলল, উহ্! এটা অসহ্য, রাজার আদেশে এই লোকটাকে হত্যা করা হবে। আহা! এই সময় যদি সত্যিকারের রাজকুমার ফিরে আসত।

সেদিন বিকালে লর্ড হাটফোর্ড রাজকুমারের সঙ্গে দেখা করে বলল, তুমি যেই হও, তুমি যে রাজকুমার নও এ-কথা অস্বীকার করবে না। টমও ভাবল, ঠিক আছে তারা যেভাবে বলে সেভাবে চলে দেখি। এরপর থেকে টম রাজকুমারের যাবতীয় কাজ করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু সে পদে পদে ভুল করতে লাগল। যেমন ভালো তোয়ালে নষ্ট হবে মনে করে হাত মুছতে ভয় পেতে লাগল। গোলাপজল দেয়া হাত ধোয়ার পানি সে পান করে ফেলল। ফলমূল বাদাম সব পকেটে পুরে ফেলতে লাগল। সেদিন বিকেলে অসুস্থ রাজার অবস্থা আরও অবনতি হলো।

রাজার সঙ্গে রাজার পরামর্শদাতা লর্ড চ্যান্সেলর দেখা করলেন। রাজা বললেন, আমি শীঘ্রই মারা যাব। ডিউক অব নরফোকের মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করতে হবে। তাই একটা মৃত্যুর পরোয়ানা লিখে নিয়ে এসো, আমি তাতে আমার সিল দিয়ে দিই। রাজা বিছানায় উঠে বসতে চাইলেন কিন্তু দুর্বলতার জন্য পারলেন না। কিন্তু বড় সিলটা অনেক খোঁজার পরও পাওয়া গেল না। রাজা মনে মনে বললেন, আমি রাজকুমারের কাছে সিলটা রেখেছিলাম। কিন্তু রাজকুমারকে জিজ্ঞাসা করা হলো, সে বলল যে সে সীলটা কোথায় রেখেছে তা মনে করতে পারছে না। আপাতত ছোট সীল দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। রাজকুমারকে আনন্দিত রাখার জন্য তাকে নৌবিহারে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু এতসব আনন্দের মধ্যে থেকেও সে সুখী হতে পারছিল না।

এদিকে সত্যিকারের রাজকুমার রাস্তায় রাস্তায় লাঞ্ছিত হচ্ছিল। রাজকুমারকে এই লাঞ্ছনার হাত থেকে

বাঁচানোর জন্য একজন জোয়ান এগিয়ে এসে সবাইকে বাধা দিল। ফলে সৈনিকের সঙ্গে বিদ্রুপকারীদের তর্ক শুরু হলো। আর ঠিক এই সময় রাজার ঘোড়সওয়ারেরা সেই রাস্তায় তাদের মাঝখানে এসে পড়ল এবং সৈনিক ও রাজকুমার সবার থেকে আলাদা হয়ে পালিয়ে গেল।

এর কিছুক্ষণ পর রাস্তায় রাস্তায় এক ফরমান পাঠ করা হলো। এতে সবাইকে বলা হলো যে, রাজা মারা গিয়েছেন এবং রাজকুমার এডওয়ার্ড নতুন রাজা হয়েছেন। টম তার উপদেষ্টা লর্ড হাটফোর্ডকে জিজ্ঞাসা করল, আমি যদি এখন থেকে রাজা হয়ে থাকি তাহলে আমার আদেশ বহাল থাকবে। লর্ড হাটফোর্ড বললেন, নিশ্চয়ই আপনার হুকুমই আইন। টম ক্যান্টি তখন বলল : আমার রাজত্ব হবে দয়ার, ক্ষমার। কোনো রক্তপাত হবে না আমার রাজত্বে এবং নোরফোকের মৃত্যুদন্ড আমি তুলে নিয়ে তাকে মুক্ত করলাম।

এদিকে রাজকুমার যখন তার নতুন বন্ধুকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিল তখন রাজার মৃত্যুসংবাদ শুনে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, আমার বাবা মারা গিয়েছেন। নতুন সৈনিকটি বলল, ওহো আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে তুমি রাজকুমার এডওয়ার্ড, এ দেশের নতুন রাজা। সৈনিক মনে মনে ভাবছিল : আহা বেচারা, তার মাথাটা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আমি সব অবস্থাতে এই ছেলেটিতে আপদে-বিপদে রক্ষা করে যাব।

এরপর সৈনিকটি রাজকুমারকে একটা সরাইখানাতে নিয়ে গেল। কিন্তু যেইমাত্র তারা সেখানে ঢুকতে যাবে তখনই টমের বাবার সঙ্গে দেখা। সে এগিয়ে এসে বলল, এবার তুমি পালিয়ে যেতে পারবে না বাছাধন, তোমাকে আচ্ছা করে পিটুনি দেব। সৈনিকটি লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ছেলেটি তোমার কী হয়? লোকটি উত্তর দিল, এই বজ্জাত ছেলেটি আমার ছেলে। রাজকুমার বলে উঠল, মিথ্যা কথা, আমাকে যেন এই লোকটার জিম্মায় ছেড়ে দিও না। সৈনিক বলল, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। তুমি আমার সাথেই থাকবে। জন ক্যান্টি তখন গজরাতে গজরাতে বলল, আচ্ছা দেখা যাবে। সৈনিক তখন তার খাপ থেকে তলোয়ার বের করে বলল, সাবধান একে ছুঁয়েছ কি তোমার একদিন কি আমার একদিন। এই ছেলে আমার তত্ত্বাবধানে থাকবে। তুমি কি মনে করো তোমার মতো একজন জঘন্য ব্যক্তির হাতে একে ছেড়ে দেব? যাও এখান থেকে সরে পড়ো, আর এ ব্যাপারে চুপচাপ থাকতেই চেষ্টা করো।

সৈনিক রাজকুমারকে বলল, আমি থাকতে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না বা কেউ জ্বালাতনও করতে পারবে না। রাজকুমার বলল, সৈনিক তোমাকে ধন্যবাদ, আমি যখন আমার সিংহাসনে আরোহণ করব তখন তোমার কথা আমার মনে থাকবে। তারপরে সরাইখানাতে যেয়ে রাজকুমার ঘুমাল আর সৈনিক তার জন্য একটা পোশাকের ব্যবস্থা করার জন্য চলে গেল।

ভোরে সৈনিক নিজ হাতে একটা পোশাক মেরামত করে নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখে রাজকুমার বিছানায় নেই। তখন সে দৌড়ে সরাইখানাওয়ালার কাছে গিয়ে হুমকি দিল। তখন সরাইখানাওয়ালা বলল, ও তো আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছে। আপনার সংবাদবাহক এসে খবর দিয়েছে যে আপনি তাকে লন্ডন ব্রিজের ওখানে দেখা করতে বলেছেন।

সংবাদবাহক কি একা ছিল?

হ্যাঁ, কিন্তু সে যখন ছেলেটিকে নিয়ে চলে গেল তখন আরও একজন বদমাইশ প্রকৃতির লোক তাকে অনুসরণ করছিল।

একথা শুনে সৈনিক ছুটল রাজকুমারের খোঁজে।

পোস্টটি শেয়ার করুন