টুনটুনি আর টুনটুনা – জসীম উদ্দীন

টুনটুনি আর টুনটুনা
– জসীম উদ্দীন

টুনটুনি আর টুনটুনা, টুনটুনা আর টুনটুনি। এ ডাল হইতে ও ডালে যায়, ও ডাল হইতে সে ডালে যায়, সে ডাল হইতে আগডালে যায়, আগডাল হইতে লাগডালে যায়, বেগুন গাছে যায়, লঙ্কাগাছে যায়, আমগাছে যায় ; জামগাছে যায় ; বল ত খােকাখুকুরা, আর কোন কোন গাছে যায় ? যে আগে বলিতে পারিবে তারই জিত।

কাঁঠাল গাছে, পেয়ারা গাছে, লিচুগাছে আরও কত গাছে যায়। শুধু কি ফলের গাছে, ফুলের গাছে যায় না? কি কি ফুলের গাছে যায় ? আগে বলা চাই। বুঝিয়াছি গােলাপ গাছে টগর গাছে হাসনাহেনার গাছে, কয়টা গাছের নাম করিব ? সব গাছে যায়।

সারাদিন কেবল ফুরুৎ ফুরুৎ। এ গাছ ও গাছ করিয়া টুনটুনিদের জীবন কাটে।

একদিন টুনটুনা টুনটুন করিয়া টুনটুনিকে বলে, “দেখ টুনটুনি! আমাদের যদি টাকা-পয়সা থাকিত তবে কি মজাই না হইত। তােকে ভালমতাে একখানা শাড়িও কিনিয়া দিতে পারি না। আমি একখানা ভাল জামা-কাপড়ও পরিতে পারি না । দেশের বড় লােকেরা কত রং-বেরঙের জামা-কাপড় পরে, কেমন বুক ফুলাইয়া চলে।”

টুনটুনি বেশ গুমর করিয়া বলে, “দেখ টুনটুনা! শুনিয়াছি বনের মধ্যে নাকি সােনার মােহরভরা ঘড়া থাকে । আমি যদি তার একটা কুড়াইয়া পাই, তবে বেশ মজা হয়।”

টুনটুনা বলে, “সত্য কথাই বলিয়াছিস। দেখ টুনটুনি! বনের মধ্যে খুঁজিয়া পাতিয়া যেমন করিয়া হােক, একটা মােহরভরা কলস আমি বাহির করিবই।”

টুনটুনি বলে, “তা তুমি বনের মধ্যে খুঁজিয়া খুঁজিয়া দেখ, কোথায় মােহরভরা কলসি আছে ; আমি এদিকে বাসা আগলাই।”

টুনটুনা এ বনে খোঁজে, সে বনে খোঁজে। বেতের ঝােপের আড়াল দিয়া, শিমুল গাছের গােড়া দিয়া, হিজল গাছের তলা দিয়া, কোথাও মােহরভরা কলসি পায় না ।।

খুঁজিতে খুঁজিতে খুঁজিতে গহন বনের ভিতর টুনটুনা এক কড়ার একটা কড়ি তালাশ করিয়া পাইল। তাই ঠোটে করিয়া রােদে ঘামিতে ঘামিতে, বােঝার ভারে হাঁপাইতে হাঁপাইতে, টুনটুনা ঘরে ফিরিয়া আসিল। “টুনটুনি! শিগগির আয়, শিগগির আয়! দেখিয়া যা কি আনিয়াছি!”

এই বলিয়া ঠোট হইতে কড়িটি নামাইয়া টুনটুনা জোরে জোরে নিশ্বাস লইতে লাগিল। টুনটুনি ব্যস্ত-সমস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করে, “বল না টুনটুনা! কি হইয়াছে?” টুনটুনা বলে, “আগে আমাকে বাতাস কর, যা মেহনত করিয়া আসিয়াছি!”

টুনটুনি ব্যস্ত ত্রস্ত হইয়া দুইখানা পাখা নাড়িয়া নাড়িয়া টুনটুনাকে বাতাস করে। কিন্তু কিযে একটা হইয়াছে জানিবার জন্য টুনটুনির মন কেবল উসখুস করিতে থাকে।

অনেকক্ষণ বাতাস করিয়া টুনটুনি বলে, “বল-না টুনটুনা! কি হইয়াছে?”

টুনটুনা বলে, “আগে আমার হাত পা ভাল করিয়া টিপিয়া দে, যা হয়রান হইয়া আসিয়াছি !

টুনটুনি টুনটুনার পা টিপিয়া দেয়, পাখার পালকগুলিতে ঠোট পুঁজিয়া আদর করিয়া দেয়। চুপটি করিয়া টুনটুনা যেন ঘুমাইয়া পড়ে। কি যে একটা হইয়াছে শনিবার জন্য টুনটুনির আর সয় না। অনেকক্ষণ পরে টুনটুনি টুনটুনাকে বলে, “এবার বল-না টুনটুনা কি হইয়াছে ?”

টুনটুনা বলে, “এমন একটা কিছু হইয়াছে যা কখনও হয় নাই।”

“কি হইয়াছে বল-না টুনটুনা !” টুনটুনির ধৈর্য আর মানিতে চাহে না।

টুনটুনা আরও খানিক দম লইয়া বলে, “আমরা বড়লােক হইয়া গিয়াছি।”

“বড়লােক কেমন রে টুনটুনা! বড়লােক হইলে কি হয় ?” টুনটুনি ঠোট উঁচাইয়া টুনটুনাকে জিজ্ঞাসা করে।

“তাই বুঝিতে পারিলি না ? এখন হইতে আমরা আর গাছের ডালে ডালে ফুলের খোঁজে ঘুরিব না, আকাশে উড়িয়া পােকা মাকড় ধরিব না, বেগুনগাছের কাঁটা খাইয়া ফুলের খোজেও বাহির হইব না।”

টুনটুনি চিৎকার করিয়া মরাকান্না কাঁদিয়া উঠে, “ও মাগাে, তবে আমাদের কি হইবে গাে! আমরা কি তবে খোড়া হইয়া যাইব নাকি গাে?” | টুনটুনা বলে, “দূর বােকা কোথাকার! এখন আমরা বড়লােক হইয়াছি। এখনও কি গাছের ডালে ডালে পরিশ্রম করিয়া বেগুন ফুলের খোঁজে যাইব ?”

“তবে আমরা কি খাইব গাে?” টুনটুনি ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠে ।

“আরে পােড়ারমুখি! আর কি আমাদের খাওয়ার ভাবনা করিতে হইবে ?” টুনটুনা বলে।

টুনটুনি আরও একটু কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করে, “তবে কেমন করিয়া খাইব?”

টুনটুনা এক কড়ার কড়িটি দেখাইয়া বলিল, “এইটি দিয়া যা যা দরকার হয়, সব কিনিব।”

টুনটুনি বলে, “সন্দেশ, রসগােল্লা, পানতােয়া, মিহিদানা সব কিনিতে পারিব ? যা কিছু কিনিতে পারিব ? চকলেট, লজেন্স, বিস্কুট ?” টুনটুনি লেজ নাচাইয়া জিজ্ঞাসা করে।

টুনটুনা উত্তর করে, হাঁ-হাঁ সবকিছু।”



টুনটুনি বলে, “আমার গয়না, হাতের বালা, গলার মালা, কানের মাকড়ি?”

“সবকিছু এই এক কড়ার কড়ি দিয়া কিনিব, সাইকেল কিনিব, মােটরগাড়ি কিনিব, উড়ােজাহাজ কিনিব।” টুনটুনা বলে।

দুইজনে বসিয়া ভাবিয়া ঠিক করে, আর কি কি জিনিস তাহারা কিনিবে। কি কি বই কিনিবে, হাওয়া বদল করিতে কোন কোন দেশে যাইবে।

বল ত সােনামণিরা! তাহারা কি কি কিনিবে, কোন কোন দেশে যাইবে ? যে আগে বলিবে তারই জিত।

এক কড়ার কড়িটি বাসার মাঝখানে রাখিয়া টুনটুনি আর টুনটুনা তার চারদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচে আর গান করে,

“রাজার আছে যত টাকা,
মােদের আছে তত টাকা।”

তারা নায় না, খায় না, বেড়ায় না, শশায় না, ঘুমায় না, মনের আনন্দে সেই এক কড়ার কড়ির চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচে আর সেই গান গায় –

“রাজার আছে যত টাকা,
মােদের আছে তত টাকা।”

একদিন হইয়াছে কি ? সেই দেশের রাজা শিকারে চলিয়াছেন। আগে পিছে মন্ত্রী-কোতােয়াল, লােক-লশকর, পেয়াদা-পাইক কেবল গমগম করিতেছে। যাইতে যাইতে যাইতে তাহারা সেই টুনটুনি আর টুনটুনার বাসার কাছে আসিয়া উপস্থিত। তখন রাজা শুনিতে পাইলেন, টুনটুনি আর টুনটুনা গান গাহিতেছে।

“রাজার আছে যত টাকা,
মােদের আছে তত টাকা।”

কি, এত বড় বুকের পাটা! ছােট্ট এতটুকুন টুনটুনি, এক রত্তি টুনটুনা তারা গান গায়—

“রাজার আছে যত টাকা,
মমাদের আছে তত টাকা।”

এতবড় রাজদ্রোহীদের সাজা হওয়া উচিত। কোনদিন তারা রাজার রাজ্য আক্রমণ করিয়া বসে তার ঠিক কি! | তখন রাজা হুকুম করিলেন টিকটিকি পুলিশকে, “দেখ ত কি আছে উহাদের বাসার মধ্যে।”

টিকটিকি পুলিশ টিটি করিয়া রাজ্যের যত খবর আনিয়া রাজাকে শােনায়। রাজার হুকুম পাইতে না পাইতেই টিকটিকি পুলিশ টুনটুনির বাসায় যাইয়া দেখিয়া-শুনিয়া সরেজমিনে তন্নতন্ন করিয়া খানাতল্লাশ করিয়া রাজার কাছে আসিয়া নিবেদন করিল, “মহারাজ! টুনটুনি পাখির বাসায় এক কড়ার একটা কড়ি আছে।”

“কি, এক কড়ার একটা কড়ির জন্য টুনটুনির এত আস্পর্ধা! ওর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত কর। ঘর-দোর যা কিছু আছে ভাঙিয়া ফেল।” গােস্বায় রাজা কলাপাতার মতন কাঁপিতে লাগিলেন।।

রাজার মুখ হইতে কথা বাহির হইতে না হইতে শহর কোতােয়াল সৈন্যসামন্ত, দারােগা-পুলিশ লইয়া টুনটুনির বাসা ঘিরিয়া ফেলিল। তারপর এক কড়ার কড়ি আনিয়া রাজকোষে জমা দিল, রাজার হাতি গিয়া টুনটুনি পাখির বাসা ভাঙিয়া পায়ের তলে পিষিয়া ফেলিল।